Youtube আমার ভগবান

কাজে গাড়ি চালিয়ে যাওয়াতে পয়তাল্লিশ-মিনিট/একঘণ্টা মতন লেগেই যায় আমার প্রত্যেকদিন। ফেরার পথেও একই ব্যাপার। এর মাঝে আমি নিজের Sprint কোম্পানির দেওয়া সিমাশুন্য ডেটা-প্ল্যানের সুযোগ সানন্দে নিই। আমার পছন্দের গানবাজনা বেশিরভাগই দেখি তাদের অ্যালবাম বা মিউজিক-ভিডিও হয় না। এদিকওদিক থেকে বহু চর্চা করে (আর বহু আজেবাজেও এর মধ্যে শোনা হয়ে যায়) নিজের পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করি। এর জন্যে আমার কাছে আছে নিয়ত, সময়, আর ডেটা-প্ল্যানটা। সাথে আছে গাড়ির ব্লুটুথ যার জন্যে ফোনের বাজনা গাড়ির গমগমে অডিও সিস্টেম দিয়ে ভালো ভাবেই আসে। গান গাড়ির মধ্যে bassটা বাড়িয়েও যদি ভালো না শুনতে লাগে, তবে অপদার্থ।

গতকাল রাস্তায়ে যাওয়ার পথে Youtubeভগবান আমাকে অনুষঙ্গি ভিডিওদের মধ্যে দেখালেন এই রত্নটি।

আজকের মধ্যে বোধহয় ১০-১৫বার শুনেছি এটা। প্রত্যেকবার একটা নতুন কিছু মনে হয়। একবার হয়ত আবহ সঙ্গীতের দোতারার খেল কোন জায়গায়ে আমাকে স্তম্ভিত করে ওঠে, বা হঠাত করে একটা কথা বুঝতে পেরে যাই যার জন্যে পুরো লাইনটা এবার বোঝার সম্ভাবনা হয় (বলেছিলাম না, বাংলাটা কাঁচা আছে)। আপসোস হচ্ছে একটু কারণ সমস্ত কথাগুলো ইন্টারনেটে পাচ্ছি না। ভিডিও যিনি আপলোড করেছেন, তিনি লালনগীতি লিখেছেন তবে এটা লালনের লেখা নয়। ভুনি পর্যন্ত শুনলে দেখবেন এটি মকসেদ আলি সাঁইএর লেখা।

তবে গান, ও সঙ্গীত উপস্থাপনা কি সাংঘাতিক, উফ। মাটির গান, মাটির তৈরি যন্ত্র দিয়ে গাইলে কিরকম এক অন্তর্ভুক্ত ভাবে গায়ে কাঁটা দেয়। আর টুনটুন শাহ নিজের আশ্রমে বসে পুরো ভাব ধরন করে গাইছেন, এর চেয়ে অচ্ছিদ্র আর কি হতে পারে? কোন মঞ্চে বা মেলায়ে নয়, নাই বা এলবাম রেকর্ডিঙে (যত বাউল এলবাম শুনি, সবগুলোতেই লক্ষ্য করেছি শিল্পীরা নিজ আঞ্চলিক বাংলায়ে গান না, আর দোতরা/খোল/তব্লা/মন্দিরা ইত্যাদি ছন্দোবদ্ধ যন্ত্রপাতি সব কটা দোমে দিয়ে বেশি করে বাঁশি বা হারমোনিয়ামে ভলিউম লাগায়ে)…সোজ্জা কুষ্টিয়ার লালন আশ্রম থেকে আমার ওয়াশিংটনডিসির ট্র্যাফিকে আটকানো গাড়ি অব্দি। এই না হলে বৃথাই বলতাম যে Youtube আমার ভগবান।

এই গানের লেখক যে লালন নয়, কিন্তু মকসেদ আলি, তার টের ভুনিতেও পাই, আবার গুগলে কয়েকটা লিরিক্সে সার্চ দিলেও তা পাওয়া যায়। আমি গুগলে দিলাম “মহাকাজে মহাধন্য মহামান্য মহাজন”, আর একমাত্র সার্চ রেসাল্ট শুধু এইটাই এল:

http://chhotokabita.com/bd/রণে-ও-ধ্যানে-মকছেদ-আলী-সাঁ/

ওই লিঙ্কে তার জীবনী দেওয়া আছে। অতি সুদ্ধ বাংলায়ে লেখা, যার অর্ধেক কথা এখন বোঝবার ক্ষমতা নেই। যা বুঝতে পারছি, উনি বাংলাদেশের ৭১এর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কাজি নজরুলের মতন এক বিদ্রোহী ও পারমার্থিক কবী। ওনার এত ভালো বিশদ জীবনী ইন্টারনেটে, তবুও কোন উইকিপিডিয়াতে এন্ট্রি নেই, অদ্ভুত ব্যাপার।

আজকের সঙ্গীত চর্চা এই রইল। এরকম মাটির গান আপনাকেও যদি আমার মতন ছুঁয়ে যায়, তাহলে জানাবেন। গানের কথা যদি সমস্তটা বোঝেন বা কোথাও লিরিক্সের সন্ধান পান, তাহলে আমাকে জানিয়ে দিন।

Advertisements

স্বাগতম জানাই

সবাইকে নমস্কার,

এই ব্লগটা শুরু করা আমার অনেক দিনের কল্পনা। এইখানে আমি বাংলাতেই লিখব নানা বিষয় নিয়ে যেগুলোর প্রতি আমার ব্যাক্তিগত প্রভাব আছে, যেমন দুনিয়ার খবরাখবর, নিজের সঙ্গীত চর্চা, ইতিহাস চর্চা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, রান্নাবান্না, ধর্মালোচনা, ইত্যাদি।

প্রথম লেখা, তাই নিজের ব্যাপারে আগে একটু বলি। বাংলা ভাষার সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সম্পর্ক। ছেলেবেলায় ইংলিশ মিডিয়াম কনভেন্ট স্কুলে যেতাম কলকাতায়ে। তখন বাংলার প্রতি অনুভূতি বিরক্তি আর ঘৃণার মধ্যিখানে। ইংলিশটা কি সহজে আসত। বাংলাটাই সাংঘাতিক কঠিন। ক্লাস ৪এ বঙ্কিমচন্দ্র, এমন সব শব্দতালিকা যা জন্মে ব্যাবহার করব না, যেমন “নিশিতফুল্লকুসুমজুগলবত”, এইগুলোতে ধস্তাধস্তি খেতাম। মনে পড়ে আমার যে সমস্ত সাবজেক্টের মধ্যে টপ মার্কস পেতাম অঙ্ক/ফিসিক্স/কম্পুটার গুলতে, তারপর ইংলিশ লিটারেচার আর রাইটিঙে, আর সবচেয়ে নিচে ছিল বাংলা সাহিত্য ও রচনাবলীতে (এটা জেনে বাকি ব্লগ পড়ুন হাহা)। সাধারণত ক্লাসে ফারস্ট/সেকেন্ড আসতাম সব কিছু মিলিয়ে, তবে মাতৃভাষাটাই আমাকে ডোবাত। ক্লাস ৮এর মিডটার্মে বাংলা রচনায়ে ১০০এ ৫১টা আমার এখনও মনে আছে। নিশ্চয়ই এইরকম মার্কস নিয়ে বকুনিও খেয়েছি, আর মনে হয় উল্টে এরকমও কয়েকবার বলেছি “এটার কি দরকার?” “কি লাভ?” দাদু-দিদারা ছোট ছেলের একথায়ে কি কষ্টবোধ করে থাকতে পারে, তা ওরাই জানে।

ক্লাস ৮এর শেসে আমি মায়ের সাথে আমেরিকায়ে চলে আসি। তখন জানতাম না বা বুঝতাম না কেন, তবে হঠাত ডাইরিতে লেখা আরম্ভ করি…বাংলাতে। ওই ৫১/১০০ মার্কস ওয়ালা বাংলায়ে কলম চালাতাম। পাতার পর পাতা, আন্তাবড়ি, যা খুশি। সেই বয়সের ভাবনা চিন্তা, সুতরাং কোন মেয়েকে আমায়ে ভাল লাগছে, কে আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না, এই নিয়েই সব লিখতাম। বাংলাটার “দরকার”বোধ এবার এলো। ডাইরিটা অন্যের হাথে পড়লে কারুর কাজে লাগবে না…আগামী ৫০ মাইলের মধ্যে আমিই একমাত্র যে এই একক লিপিটি বোঝে।   যদিও বেশিরভাগ কথাগুলো ইংলিশেরই ছিল, সেগুলোকে জোর করে বাংলালিপিতে লিখে দিতাম। কি অবস্থা। তাও সে যে আঁকড়ে ধরে আছি যা হোক করে সে বয়স থেকে, তা এখনও ধরে আছি।

আর চেষ্টাও চলছে যাতে বাংলাভাষায়ে জ্ঞানকোষটা বাড়াতে পারি। কারণটা ঠিক এখনও জানি না। আজও খুঁজে যাচ্ছি মূল কারণটাই বা কি। এত পরিশ্রম কেন এই লক্ষ্যের পেছনে? কোন কাজে তো মনে হয় না কোনদিন লাগবে…এটাও মানি যে মানুষ সব জিনিস লাভের জন্যেই করে না। এক অন্য ধরনের সুখলাভ করতে সকলেরই ইচ্ছা, যে সুখের পথে পয়শা/নাম ইত্যাদি লক্ষ্য নয় কিন্তু কেবল এক মধ্যবর্তী বস্তু। যাক, বেশি তত্ত্ব জ্ঞান চর্চা করব না এ নিয়ে, শুধু এটাই বুঝছি আজকাল যে বাংলাভাষার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাতে ওই ধরনের সুখের সাথেই জড়িত।

কখনও এই সুখের পেছনে দৌড়ুতে দৌড়ুতে আবার হথাসও হয়ে পড়ি। মনে হয় ১:৩৯:৪৪এর ভদ্রলোকটার মতন:

তখন আমি এই গানটা মনে করি,

আজকের জন্যে এই গানটা রইল, পরে আবার লিখব।