স্ট্রেট ড্রাইভ

আজকাল খবরে এই জে-এন-ইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলের কান্ডকারখানা শোনা যাচ্ছে। তার চেয়েও বেশি এই তর্কবিতর্ক ফেসবুকে পরিনত হচ্ছে। আমার ধারনা ইন্টারনেটের এই যুগে নামহীনতা বা অন্তত মুখোমুখি আড্ডা বিনে দিন কে দিন লোক বেশি পক্ষ্যভুক্ত হয়ে পড়ছে, যা হয়ত আবার উলটে বাস্তব জগতে প্রকাশ করছে। মানুষের মধ্যে দলাদলি এক স্বাভাবিক কারবার,  তবে এত বিষাক্ত ও অবারিত দলাদলির বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়া জরুরি। নিজের মত থাকা মানে অন্যের মত বাতিল, এ এক ভয়ানক ফলে পরিনত হতে পারে। আশা করি ভারতবর্ষে কোনদিন সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদির মতন রাস্তায়ে-রাস্তায়ে কাটাকাটি গোলাগুলি না আরম্ভ হয়। ছোট্ট উস্কুনিতেই বিশাল আগুণ জলতে পারে। যারা বাম/ডান ইত্যাদি নিয়ে জড়িত, তাদের মনে রাখা উচিত একে অপরকে এত ঘৃণা করলে দুয়েরই ক্ষতি। মনে থাকে যেন ভারত উপমহাদেশের দেশভাগ আমাদের দাদু-দিদাদের জেনারেশনেই হয়েছিল, অর্থাৎ জীবিত স্মৃতির মধ্যেই…

এই বিষয়টি নিয়ে আমি লিখব কি লিখব না, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে এদিক ওদিক করছিলাম। নিজের মতটাই বা কি, ঠিক ধরতে পারছিলাম না। গত পরশুর অনুপম খেরের ইন্টার্ভিউ পরে বুঝলাম ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়িয়েছে।

http://blogs.timesofindia.indiatimes.com/the-interviews-blog/why-shouldnt-we-challenge-calls-for-indias-ruin-umar-khalids-playing-muslim-card-intolerance-is-an-anti-modi-ploy-anupam-kher/

আপত্তি নিলাম, কারন প্রথমেই ভদ্রলোক বলছেন “আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসি, তবে দেশকে গালাগাল দেওয়া চলবে না।” তাহলে আপনি সে মতপ্রকাশের ব্যাক্তিগত অধিকারের বিশ্বাসি নন! ২১এ শতাব্দী বলে এ নিয়ে কেবল “lip service” দিতে হয় বলে এটা দিলেন। এইটি পড়ে আমার মাথায়ে এল ইয়েদের কথা, যারা বলে “আমাকে অপমান কর, আমার আপত্তি নাই…তবে আমার নবীজিকে নিয়ে কথা তুললে আমি গলা কেটে দেব।” সব কিছুকে প্রশ্ন করা, এইটি একটি মানুষের অধিকার বলে আমি মানি। মাসে মাসে আমি কেন খাজনা দি? এ প্রশ্ন করা মানে নয় যে আমি খাজনা দেওয়ার বিরুদ্ধে। আমাকে বুঝিয়ে দাও, যে আমার খাজনা দিয়ে রাস্তাঘাট ইত্যাদি সব চলে, ঠিক আছে, বাত খতম। এ প্রশ্ন আমি নৈতিকতার মধ্যেও আনি (কোনকিছুকে পবিত্র মানি না)। অন্য লোক যখন ঘুমোয়, তখন আমি কেন তার সে মুহূর্তের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার ঘরে ঢুকে জিনিশপত্র চুরি করব না? আচ্ছা, কারন এরকম সমাজ হলে সবাই বেঘুমে এক সপ্তাহে মারা যাবে। সুতরাং আমি কোন জিনিশকে ঠিক বা ভুল বা গুন বা পাপ মুখের ওপর মানতে রাজি নই। ন্যায় ও অন্যায়, এগুলি দুই মানুষের মধ্যে এক চুক্তি। ভারত বা কোনও দেশ বরবাদি কেন হবে না, এর জন্যে এক যুক্তি থাকা প্রয়োজন, শুধু বললেই হবে না যে “এ বিষয় নিয়ে তুমি মত প্রকাশ করতে পারবে না।” তুমি কে হে?

আমার কাছে ইন্ডিয়ার প্রয়োজন প্রতীত ইতিহাস পড়ে। ভারত উপমহাদেশ, হিমালয় পাহাড় ও ভারত সাগরের মাঝে। মানব সভ্যতার এক প্রাচীন ও ধনশালী অঙ্গ। যুগের পর যুগ সে নানা রাজা-রানিদের অংশে বিভক্ত। এর কারনে এই উপমহাদেশের বাহিরের পশ্চিম/মধ্যম এশিয়ার নানা উপজাতিরা আগ্রহী হয়ে ফন্দি পাকাতো, কবে ওই ধন আমরাও ভোগ করতে পারি।  তারা একবার ভেতরটা দখল করতে সফল হয়ে গেলে নিজেরাও ভোগের লোভে দুর্বল হয়ে পড়ত, আগামী উত্তরপশ্চিম উপজাতির হাথে। ১৭৫৭এর পূর্বের ইতিহাস কেবল এই একই নাটক, বিভিন্ন নামে। তাও বোধয় এ নাটকে তেমন ক্ষতি হত না। অতএব নতুন কত্তারা মাটির ফসল ভোগ করে সেই মাটিতেই আবার বিস্তার করত। আঙ্গাস মাডিসন নামের এক বিখ্যাত অর্থবিজ্ঞানী দেখিয়ে গেছেন তাঁর কাজে যে ১৮ই শতাব্দী পর্যন্ত ভারত ও চিন বরাবর পৃথিবীর সমস্ত ধনী এলাকা ছিল। এ কথা মনে রাখা দরকার যে আর্থিক ভাবে মানুষ খুশি হলে সে অন্য কাজে মন দিতে পারে, যেমন দেহচর্চা, সংগীতচর্চা, ধর্মচর্চা, ইত্যাদি…যার কারনে ভারতীয় সভ্যতা আর সংস্কৃতি বলতে আমরা ওই ১৭০০র আগে যা উন্নয়ন হয়েছিল, তাই মনে করি। যেই আর্থিক ক্ষমতা হারাতে লাগল, তেমনি এই ক্ষেত্রেও ধন হারাতে লাগল (ব্যাতিক্রম আছে, রবিঠাকুর ভক্ত যেন লাথি না মারে আমাকে)।

এ সব তো সমস্ত ভারতীয়ই জানে। ব্রিটিশ আমল ভারতের ওপর এমন ভাবে গেল, এর উল্লেখ এবং প্রতিক্রিয়া বোধয় ইহুদিদের হলকস্ট পরযার পরের চিন্তাধারার সাথে করা যায়। “Never again” নারা দিয়ে তারা ইজ্রাএল দেশ গড়ে ফেলল। এমন কঠিন অভিজ্ঞতার পরে মানুষ নতুন করে তার পরিস্থিতিকে বিস্লেশন করে, এবং নতুন সিদ্ধান্ত নেয়। যে জাতি হাজার হাজার বছর ধরে সন্তুষ্ট ছিল নানা দেশে বাড়ি বানিয়ে ব্যাবসা আর বিজ্ঞানে জুড়ে থাকতে, তারা শেসে বাধ্য হল এক দেশ গড়তে। একই ভাবে ইন্ডিয়াও তৈরি হয়েছে এরকম করে, ইতিহাসের অভিজ্ঞতার কারনে। সে পথেও তো ভেতরে কাটাকাটি রক্তারক্তি হয়ে গেল, পুর ভারতটা ঈন্ডিয়া হয়নি। তাও যতটা আছে, এইটি ভারতের লোকের পক্ষ্যে এক উন্নতি।

এই কৃষ্ণ কানহাইয়ার ভাষণ শুনলাম। একদিকে শ্রী আমবেদকরের জয়জয়কার, জিনি এই ইন্ডিয়া গড়ার এক প্রধান অভিনেতা। আবার অন্যদিকে বলছে “আজমাল কাসাব ও আফজাল গুরু আমাদের শহিদ, ভারত কি বরবাদি।” ব্যাপারটা কি হচ্ছে? জাদবপুরে কাশ্মীরের “আজাদি” আর মনিপুরের “আজাদি” নিয়ে লোকে নারা লাগাচ্ছে। এ স্লোগান দেওয়ার অধিকার আছে অবশ্যই, তবে এরা কি ইতিহাস পড়ে না? ওদের কি ইচ্ছা ভারত উপমহাদেশে ৫০টি রাষ্ট্র বানালে মানুষের উন্নতি হবে? এই ২১এ শতাব্দীতে বাকি উন্নত পৃথিবী চলেছে মিলনের পথে, আর এরা কি চাইছে? বেশ তো, ইন্ডিয়া অভিযানটি ব্যর্থ ছিল, ভেঙে দাও। ওই ওপরের জি-ডি-পির চার্টে যেটুকুনি উন্নতি হয়েছে, আবার যাবে, আর কি? ভুলে যাও গান্ধি, আমবেদকর, আজাদ, নেহেরু, যাদের আত্মত্যাগে এই ইন্ডিয়া আজকে টিকে আছে, ভুলে যাও ইস্রর গর্ব। সবাই নিজের করে একটি জাতি/ভাষা/গত্র-র নামে একটি রাজত্ব বানিয়ে পরমানন্দে থাক। আর এখন ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের আর্মস-রেস? তখন হবে দক্ষিণ কলকাতা-উত্তর কলকাতার আর্মস রেস। কি মজা। ইন্ডিয়ার বামপন্থীরা ডানকে প্রতিরোধ করতে করতে নিজেরা যে কি না কি ধরনের ভয়ানক প্রগতিবিরোধি চিন্তাধারাদের মাথায়ে তুলে ধরছে, তার দৃষ্টি বোধয় হারিয়ে  ফেলেছে। তার সাথে হারিয়ে ফেলেছে ভারতের মানুষের উন্নতির চিন্তা। “ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন”এর মতন এক প্রগতিশীল ভাবাদর্শের ভার তারা নিজেরাই কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছে (আর এখন তার ভার নিয়েছে অনুপম খের আর বাকি বজ্রং দল জোকার-গুষ্টি)।

ইন্ডিয়ার রাজনীতি বহু বছর ধরেই এক ঘোরের মতন চলছে। অখন্ড ভারতের নাম আজকাল একটি “হিন্দুত্ব” আর “ডানপন্থী” আন্দোলন, যদিও নেতাজি বোস সফল হলে জিন্নাহকে ফায়ারিং স্কুয়াডের সামনে আনতেন। পুরানো কথা, দেশভাগ, ইত্যাদি নিয়ে মাথা আর ঘামানো কোন ইন্ডিয়ানের পক্ষে আর পোষায় না। তবে স্বাধীনতার পূর্বের কথা যখন মাঝে মধ্যেই এই কৃষ্ণ কানহাইয়া-টাইপরা তোলে, তাহলে সবারই সে অধিকার আছে। তখনকার আর-এস-এস/হিন্দু মহাসভারা ব্রিটিশদের পাচাটা, মানলাম। তবে তখনকার কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট কি আর এখনকার সাথে মেলে? নেহেরুর মতন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তাঁর নাতির শাহবানো কেসের কান্ড দেখলে বমি করতেন। আমার মতে এই সব স্বাধীনতার আগের কথা তুলে ব্ল্যাংকেট স্টেটমেন্ট ছাড়া অসৎ। তখনও ইন্ডিয়া গড়ে ওঠেনি। সবাই যে যার নিজের কল্পনা অনুজাই ব্রিটিশদের পা চাটছিল। সেরকম ভাবে দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে ভ্রাতিত্বের ধারনাই ছিল না। এমন করলে সবার মধ্যেই দোষ আছে। আমেরিকাতেও দেখা যায়, যে রিপাবলিকান দল ১৫০ বছর আগে সংখ্যালঘু এবং বন্ধী আফ্রিকান-জাতির মানুষের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মশাল ধরেছিল। সে সময় ডেমক্রাটরা ছিল ইউরপিয়-জাতির মালিকদের দল। ইতিহাসের কুখ্যাত কু ক্লাক্স ক্ল্যানের অনেক নেতারা দিনের বেলায়ে ডেমক্রাট দলের নেতা ছিল। আজকে ঠিক উলটটা হয়ে গেছে। বারাক হোসেন ওবামা হলেন ডেমক্রাটদের, আর ডনাল্ড ট্রাম্প হল রিপাবলিকানদের। এই উদাহরনে এটাই বোঝা যায় যে রাজনীতি এক অদ্ভুত জিনিস। এতে দলগুলোর নাম কেবল নামই। আসলে দেখতে হয় এ মুহূর্তে কোন নামের দল প্রগতিশীল বা পশ্চাদমুখি চিন্তাধারা নিয়ে চলেছে। ইন্ডিয়ার দুর্ভাগ্য যে তাঁর কোনই আর ১০০% প্রগতিশীল দল নেই। স্বাধীনতার পর পর বোধয় ছিল, এখন ফুরিয়ে গেছে।

কিছু এডিট দিচ্ছি, যাতে লোক আমার মত ভুল না বোঝে। গোটা ভারতবর্ষে বহু সামাজিক সমস্যা ছিল এবং আছেও। এ সমস্যা মানসিক, এর সমাধান কোন ১-শটে হবে না (যেমন লোকে বলে “education” হলেই নাকি সবাই খুব সৎ মানুষ হয়ে যাবে)। এধরনের বাক্তাল্লাহতেও সে একই সমস্যাটা প্রকাশ করে, যে মানুষ ইস্কুলে পড়াশুনা করলে তার চরিত্র ও মন উন্নত হবে। একদিক থেকে দেখলে এটাও একধরনের বৈষম্য বর্ধিত করে। জাতিভেদের স্বীকার যারা, বা ইন্ডিয়ার সরকারের হাথে “colonial” আচরণে যারা বন্ধী, তাঁদের অবশ্যই দাবী আছে। ইন্ডিয়া একটা দেশ বা একটা সরকার যদি হয়েই থাকে, সেটার মূল কারন যা নিয়ে আমি ওপরে উল্লেখ করেছি (আন্তর্জাতিক মাত্রায়ে কড়া হওয়া যাতে ফের কেউ এধরনের শাসন না করতে পারে)। এর মানে নয় যে এবার কখগ জাতের মানুষ বাকিদের শাসন করবে । যেহেতু ব্যাপারটা তাতেই পরিনত হয়েছে ৭০ বছর বাদে, তাহলে এই কথাটি সেই নির্যাতিত মানুষদের একটা ন্যায্য দাবী যে তারা কেন মুখ বুজে এই ইন্ডিয়াটা সহ্য করবে? যে সম্মান ও উন্নতি আমরা ব্রিটিশ আমলে হারিয়েছি, সে সম্মান মানুষ কি করে AFSPA ধরনের আইনের জুলুমে ফেরত পাবে? তাই বলে দেশ ভেঙে দাও বা বিভিন্ন রাজ্যের আজাদি? তাঁদের বেদনা আমরা হয়ত বুঝি না, কিন্তু তাঁদের ওপর আঘাতটা সকল ইন্ডিয়ানের ওপর আঘাত, তাঁদের ব্যাথা বাকি সমাজের লজ্জা। “Of the people by the people for the people”, “some people” নয়। এইটা সবার মনে রাখা উচিত। যারা সমাজে ক্ষমতার স্থানে আছে, তাদের ওপর দায়িত্ব বেশি, কারন ওরাই এত বছর স্বাধীন দেশের রাজত্ব ডুবিয়েছে। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের বোঝার সময় যে দেশটা ওদেরই। মানুষের মানুষ হওয়ার অধিকার কেউ ওপর থেকে দান করে না, এগুলো তারই হাথে। যে প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে সে অধিকার রক্ষার জন্যে, তার বরবাদি চাওয়াটা নিজের গোলপোস্টে গোল মারা।

কুমীর নিয়ে আজব কান্ড

গতকাল খবরে এক বিদ্ঘুটে ভয়ানক গল্প শুনলাম। আমেরিকার সর্বদক্ষিণস্থ রাজ্য ফ্লরিডাতে একজন লোক রাস্তা থেকে একটা জ্যান্ত কুমীর ধরে ওয়েন্ডিজ রেস্টুরেন্টের ড্রাইভ-থ্রু-এর জানলা দিয়ে সেই পশুটাকে ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কান্ডটি হয়েছিল গত অক্টোবর মাসে, লোকটা ধরা পড়েছে কালকে। গল্পটাতে এও শুনলাম, যে বন্যপ্রাণী সরকারি বিভাগ থেকে লোক যখন আসে, তখন তারা তাদের নানা সাঁড়াশি যন্ত্রপাতি দিয়ে কুমীরকে বধ করে তার মুখের ওপর মোটকা টেপ লাগায়ে। তারপরে সেই কুমীরটাকে রেস্টুরেন্ট থেকে বের করে পুকুরে পৌঁছিয়ে দেয়। তার মানে প্রধান অপরাধীটার বুকের পাটা বুঝুন। জ্যান্ত কুমীরটাকে পাকড়ানোটা তো একটা কথা হল (ল্যাজ-ফ্যাজ ধরে যা হোক করে তা না হয় করল), তার ওপরে ওইটাকে আবার গাড়ির পেছনের সিট থেকে মুন্ডু থেকে ল্যাজ অব্দি ধরে নিজের শরীরের ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়ির জানালার বাইরে আরেকটা জানালার মধ্যে গুঁজে দিল। অবশ্য কুমীরটা সাড়ে-তিন ফুট লম্বা, সুতরাং অত বড় নয়। তবে কচি বাচ্চা কুমীরও নয়। একটা কামড়ে মানুষের যেকোনো অঙ্গ ছিঁড়ে নিতে পারে খুব সহজেই। রেস্টুরেন্ট কর্মী যখন তার পেছন ফিরে ঘুরেছিল, তখনই নাকি এই কুমীরটাকে সেই জানালার মধ্যে ঢোকানো হয়। যে অপরাধী, তার বুকের পাটা থাকলেও, সে বেচারা কর্মীর ভয়ের কথা ভাবুন। হঠাত পেছন ঘুরে মাটিতে একটা আস্ত কুমীর। আমি তো ছোট টিকটিকিতে ভয় পাই, আমি হলে হুঁশ হারাতাম। লোকটা (১৮-১৯ বছরের হবে) এবং তার মাবাবারা বলছে এটা নাকি একটা খুবই নিরীহ একটা কৌতুক ছিল। তার বিরুদ্ধে লাঞ্ছনার দোষারোপ আনা হচ্ছে আদালতে। আনা উচিত, এরকম কাজের শাস্তি ভালো করে দেওয়া হোক, যাতে এরকম “prank” কারুর মাথায়ে না আসে।

ফ্লরিডা রাজ্যে আমি অনেকদিন বাস করেছি। যে শহরে এই কান্ডটি হয়েছে, সেখানে আমি ২ বছর কাজের জন্যে কাটিয়েছি। আমাদের কলকাতাও যেমন সুন্দরবনের জলাভূমির ওপর তৈরি, তেমনি বেশিরভাগ ফ্লরিডার দক্ষিণ দিকটাও এভারগ্লেড জলাভূমির ওপর তৈরি। ওখানে লোকসংখ্যা কম, আর তার ওপর উন্নত দেশে মানব-বাসস্থান বাড়ানোর প্রতি অনেক বেশি সতর্ক ও নির্ভুল আইনকানুন আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমতা রক্ষা করার জন্যে। কলকাতার জনসংখ্যা যদি দেড়কোটির জায়গায়ে দেড়-লাখ হত, তাহলে হয়ত কলকাতার রাস্তার ধারে বাঘ-হাথি-কুমীর ইত্যাদি দেখা যেত।

আমার মনে আছে ওই ওয়েস্ট পাম বিচ শহরে থাকাকালীন একটা রাত্রে আমি তেড়ে ভাত খেয়ে রাস্তায়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। রাত্তির ১১টা মতন হবে, নিরিবিলি রাস্তা, ফুটপাথে আর কেউ নেই, রাস্তার আলোও বেশ মিটমিটে আর দূরে দূরে। একটা জায়গায়ে একটা ছোট খাল, তার ওপর দিয়ে অবশ্যই ব্রিজ আছে…হঠাত সামনে দেখি বেশ ৮-৯ ফুট লম্বা সব্জে-কালো একটা কুমীর খাল থেকে বেরুলো। ঘাস কাটিয়ে আমি যে ফুটপাথে, সেটাতে উঠল। আবার ফুটপাথ থেকে রাস্তায়ে নামল, নেমে রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারের ওপরে গিয়ে উঠে বসল। ডিভাইডারে বহু গাছ আর বড় বড় ঝোপ, সেই ঝোপগুলোর মধ্যে গিয়ে কুমীরটাকে আর দেখতে পেলাম না। আমারও বোধহয় মাথাটা একটু খারাপ। সাধারণত টিকটিকি ব্যাং সাপ এগুলোর থেকে এড়িয়ে চলি। তবে ওই মুহূর্তে আমার কৌতূহল আমার ভীরুতাকে পরাজিত করে (একে আমি নিজগুণ হিসেবে মানি, আমার মা ও স্ত্রীর মত অন্য)। আমি ভাবি সত্যিই কি এটা কুমীর? তখন আমি ফুটপাথে এগিয়ে যাই, যেখানটায় কুমীর পথ কেটে গেছিল। গিয়ে ওই ঝোপের দিকে নজর দিই। খানিকক্ষণ বাদে ঝোপে নড়াচড়া শুরু হয়। কুমীর থেকে আমি এখন ১০ ফুট দূরে, যদি সে রাস্তা ফেরত আসতে চায়। ওই মুহূর্তে বোধহয় ভয়ের চেয়েও বেশি আত্মরক্ষার অঙ্ক মনের মধ্যে চলছে। কোন দিকে তিড়িং করে পালাবো যদি আমার ওপর আক্রমণ করে…ভাগ্যিস ওই ঝোপের নড়াচড়ার পরিণতি হল যে কুমীরটা রাস্তার অন্যদিকটা পেরিয়ে অপর ফুটপাথে উঠল। উঠে অন্যদিকের ঘাস কাটিয়ে খালের অপরদিকে নেমে গেল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

সে সময়ে আমি কুমীরের চিন্তাধারাটা বুঝতে পারিনি। ব্রিজের তলা দিয়েই তো যেতে পারত যদি খালের মধ্যে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। তখন আমি ব্রিজের রেলিং টপকে দেখলাম যে ব্রিজটা সত্যিকারের খালটাকে দুভাগ করেছে। দুভাগের মধ্যে জল যাওয়ার জন্যে তিনটে মোটা পাইপ আছে, তবে কুমীর কি করে বুঝবে পাইপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়? তবুও কুমীর জানতই বা কি করে যে স্থলে উঠে এত পথ পেরুলে আবার সেই খালের অন্য ভাগে প্রবেশ করার পথ আছে? এর মানে যে কুমীরগুলো এই রাস্তা পেরুনোটা মাঝেমাঝেই করে থাকে। যত ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে থাকি, ততই যেন বুকে ডর ফিরে আসে। ভাবি, কতবার যে আমি এখান দিয়ে রাত্রি বেলায়ে জগিং করেছি। ফুটপাথে তা না হয় দেখা যায়, তবে ডিভাইডারের ঝোপের ওপর দিয়েও তো কয়েকবার নিজেই রাস্তা পেরিয়েছি। একটা ক্যাঁক করে নিজের ঠ্যাঙে কামড় খেতেই পারতাম ইতিমধ্যে। এ ঘটনার পর থেকে আমি কুমীর নিয়ে খুব সাবধানে চলা ফেরার অভ্যাস শুরু করি ওখানকার বাকি নাগরিকদের মতন।

396899_10151889287340192_484103604_n

ওই ওয়েস্ট পামে থাকাকালীন যেখানে কাজ করতাম, সেটা আরও নিরিবিলি জলাজমিতে তৈরি এলাকায়ে ছিল। ওখানে উপদেশ দেওয়া ছিল যে সন্ধ্যাবেলায়ে কাজ থেকে বেরুনোর সময় পারকিং লটে সাবধানে চলাফেরা করতে। জ্বলন্ত রোদের কারনে নাকি কুমীর আমাদের গাড়িগুলোর তলায় বসে ছায়ায় আরাম করতেই পারে। এরকম জীবনধারা কলকাতার বা ঢাকার বা কোন শহুড়ে লোকের কাছে আজব লাগতে পারে, ভয়ানকও বোধয়। তবে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও প্রবল। হয়ত দক্ষিণ ফ্লরিডার স্থানীয় বীরপুরুষের মতন আস্ত কুমীর হাথে ধরে পাকড়ানোর সাহস কোনদিন হবে না, তবে টিকটিকির ভয় থেকে আমার উন্নতিতে আমি খুশি।

খবরের লিঙ্কটা এইখানে দিলাম।

http://www.wptv.com/news/region-c-palm-beach-county/loxahatchee-acreage/man-accused-of-tossing-gator-into-wendys-drive-thru-window

চোর কথাকার

গত সপ্তাহে আমার কন্যা এ ঠান্ডা পৃথিবীতে প্রবেশ করল। আমার প্রথম সন্তান। কিরকম লাগছে সে লিখে বোঝানো অসম্ভব। কখনও আনন্দে মাতাল, বা কখনও এই অসহায় ব্যাক্তির নীরব ধ্রিষ্টির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আবার হুঁশ পেলে এক নতুন ভ্রাতৃত্বের সংঘ অনুভব করি, জগতের সমস্ত মা-বাবাদের সঙ্গে। আগে ভাবতাম, বাচ্চা তো সবারই হয়, অন্যের বাচ্চা নিয়ে লোকজন এত মাথা ঘামায় কেন? এবার বুঝতে পারছি, এ এক নতুন পর্ব জীবনের। এই যাত্রা নানা পরিবর্তনে ভরা। তাতে আমার কোন অনিশ্চয়তা বা ভয় নেই। কেবল আশাবাদী, নিজের স্বাভাবিক পরবর্তী পরিবর্তনের মাঝে নিজেকে নতুন করে চিনব।

হাসপাতালের অখাদ্য খাদ্যের থেকে মুক্তিলাভের জন্যে আমাকে কয়েক মিনিট বাইরে যেতে হয় রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনতে। সে পথে চলাকালীন দেখি আমার ইউটুবে একটা প্রস্তাবিত ভিডিওদের মধ্যে এই গানটি।

ছবিটা দেখে একটু অস্বাভাবিক মনে হল। “ছাপ তিলক” কবিতাটি পুরনো দিল্লির খুস্রো লিখেছিলেন তাঁর গুরু নিজামুদ্দিন আওলিয়ার স্মরণে। কবিতার ভাষাটি হিন্দিভাষার পিতা ব্রজভাষায় রচিত, অনেক জায়গায় আমাদের বাংলার সাথে মিল আছে যা চলিত হিন্দি বা উর্দু ভাষায়ে আজকাল আর নেই। সে ক্ষেত্রে ভাষাটি খুবই মিষ্টি লাগে। গানটি আমার অস্বস্তিকর লাগতে মনে আছে কারণ কোথাও একটা পড়েছিলাম এইটি নিয়ে যে এ গানের মূল অর্থ হচ্ছে একজন ব্যাক্তি সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইস্লাম ধর্ম সমর্পণ করছেন। এরকম ধর্মের নামে দলাদলি, বিশেষ করে প্রাচীন দেশের মাটির গানের মাধ্যমে, আমার একদম পোষায় না।  সে কারনে আমিও গানটিকে অনেকদিনই ত্যাগ করেছি। তবে ওপরের ছবিটাতে পাঁচজন মনে হয় গৌড় বৈষ্ণব কেত্তন করছেন, ব্যাপারটা কি? দিলাম টিপে। চেনা গান বাজতে লাগল।

যিনি এই ভিডিওটি আপলোড করেছেন, তার সনে লাখো সেলাম জানাই। প্রত্যেকটি ছবিতে কেবল প্রেমই প্রেম। রাধা ও মীরার কৃষ্ণপ্রেম আর সুফি দরবেশের আল্লাহ্‌র প্রতি ভক্তি, দুজনের সম্মেলনে আমার পুরনো অস্বস্তি দূর করে দিল। গানে যখন নয়ন মেলানোর কথা আসে, তখন আমার পুঁচকিটার ছোট্ট দুটো নিরীহ চোখের ধ্রিষ্টি মনে বসে পড়ে, আর আমার চোখে জল ভেসে ওঠে।

বৈষ্ণব সম্প্রদয় ও তাদের চিন্তাধারা আমি কোনদিনই হজম করতে পারিনি। অতএব আমি একুশে শতাব্দীর মানুষ। লিঙ্গের বিভাদ দেখিয়ে ভক্তি বোঝানো, যেখানে ভগবান কেবল এক মহাপুরুষ, আর তাঁর ভক্তব্রিন্দরা সব নারী, এ বড্ড সেক্সিস্ট লাগত। তার ওপর আমরা দুর্গা, সরস্বতী, জগদ্ধাত্রী, কালী, লক্ষ্মী, এনাদেরই পূজায় বড় হয়েছি, তো সেদিক থেকে বাঙালি সংস্কৃতিতে একটা আন্তরিক ফেমিনিজাম আছেই। এর সাথে নিজে নিজেকে একজন “রাধা” হিসেবে দেখতে অস্বস্তি লাগে। তবে ভিডিওটা দেখার সাথে সাথে যেন এই সব মনের অস্থিরতা গুলোও দূর হতে লাগল। ছবিগুলোতে নিজেকে রাধার চরিত্রে দেখতে লাগলাম, আর পুঁচকেটা হয়ে গেল আমার কৃষ্ণ। এ কি আবোলতাবোল? আমি না পুরুষ, আমি না তার গুরুজন? শ্রদ্ধার ডিরেকশন উলটে গেল কি করে? কিন্তু হ্যাঁ তো…বাচ্চার ধ্রিষ্টি যাতে আমার ওপরে পড়ে, তার চেতনাতেই আমি আশাবাদী হয়ে বসে থাকি। যেমন ছাতক বসে থাকে মেঘের বরিশলের অপেক্ষায়ে (লালন)। এই সমস্ত ভাবনা ও চিন্তা গানটা চলার সাথে আমার মনে বিদ্যুতবেগে অনুভব করছি।

১০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত অশান্তি দূর…ধর্ম নিয়ে দলাদলি, লিঙ্গের নামে ভেদাভেদ, নিজের অহংকার ও অস্বস্তি। খুস্রর কবিতা, নুস্রতের তান, বৈষ্ণব ও সুফি মূলভাব কয়েকটি আঁকা ছবি, আর সবচেয়ে বড় আমার ছোট্ট মেয়েটার গোলগাল মুখ…সত্যিকারের অন্তর থেকে আমার ছাপ ও তিলক ছিনিয়ে নিলি রে।