চোর কথাকার

গত সপ্তাহে আমার কন্যা এ ঠান্ডা পৃথিবীতে প্রবেশ করল। আমার প্রথম সন্তান। কিরকম লাগছে সে লিখে বোঝানো অসম্ভব। কখনও আনন্দে মাতাল, বা কখনও এই অসহায় ব্যাক্তির নীরব ধ্রিষ্টির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। আবার হুঁশ পেলে এক নতুন ভ্রাতৃত্বের সংঘ অনুভব করি, জগতের সমস্ত মা-বাবাদের সঙ্গে। আগে ভাবতাম, বাচ্চা তো সবারই হয়, অন্যের বাচ্চা নিয়ে লোকজন এত মাথা ঘামায় কেন? এবার বুঝতে পারছি, এ এক নতুন পর্ব জীবনের। এই যাত্রা নানা পরিবর্তনে ভরা। তাতে আমার কোন অনিশ্চয়তা বা ভয় নেই। কেবল আশাবাদী, নিজের স্বাভাবিক পরবর্তী পরিবর্তনের মাঝে নিজেকে নতুন করে চিনব।

হাসপাতালের অখাদ্য খাদ্যের থেকে মুক্তিলাভের জন্যে আমাকে কয়েক মিনিট বাইরে যেতে হয় রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনতে। সে পথে চলাকালীন দেখি আমার ইউটুবে একটা প্রস্তাবিত ভিডিওদের মধ্যে এই গানটি।

ছবিটা দেখে একটু অস্বাভাবিক মনে হল। “ছাপ তিলক” কবিতাটি পুরনো দিল্লির খুস্রো লিখেছিলেন তাঁর গুরু নিজামুদ্দিন আওলিয়ার স্মরণে। কবিতার ভাষাটি হিন্দিভাষার পিতা ব্রজভাষায় রচিত, অনেক জায়গায় আমাদের বাংলার সাথে মিল আছে যা চলিত হিন্দি বা উর্দু ভাষায়ে আজকাল আর নেই। সে ক্ষেত্রে ভাষাটি খুবই মিষ্টি লাগে। গানটি আমার অস্বস্তিকর লাগতে মনে আছে কারণ কোথাও একটা পড়েছিলাম এইটি নিয়ে যে এ গানের মূল অর্থ হচ্ছে একজন ব্যাক্তি সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইস্লাম ধর্ম সমর্পণ করছেন। এরকম ধর্মের নামে দলাদলি, বিশেষ করে প্রাচীন দেশের মাটির গানের মাধ্যমে, আমার একদম পোষায় না।  সে কারনে আমিও গানটিকে অনেকদিনই ত্যাগ করেছি। তবে ওপরের ছবিটাতে পাঁচজন মনে হয় গৌড় বৈষ্ণব কেত্তন করছেন, ব্যাপারটা কি? দিলাম টিপে। চেনা গান বাজতে লাগল।

যিনি এই ভিডিওটি আপলোড করেছেন, তার সনে লাখো সেলাম জানাই। প্রত্যেকটি ছবিতে কেবল প্রেমই প্রেম। রাধা ও মীরার কৃষ্ণপ্রেম আর সুফি দরবেশের আল্লাহ্‌র প্রতি ভক্তি, দুজনের সম্মেলনে আমার পুরনো অস্বস্তি দূর করে দিল। গানে যখন নয়ন মেলানোর কথা আসে, তখন আমার পুঁচকিটার ছোট্ট দুটো নিরীহ চোখের ধ্রিষ্টি মনে বসে পড়ে, আর আমার চোখে জল ভেসে ওঠে।

বৈষ্ণব সম্প্রদয় ও তাদের চিন্তাধারা আমি কোনদিনই হজম করতে পারিনি। অতএব আমি একুশে শতাব্দীর মানুষ। লিঙ্গের বিভাদ দেখিয়ে ভক্তি বোঝানো, যেখানে ভগবান কেবল এক মহাপুরুষ, আর তাঁর ভক্তব্রিন্দরা সব নারী, এ বড্ড সেক্সিস্ট লাগত। তার ওপর আমরা দুর্গা, সরস্বতী, জগদ্ধাত্রী, কালী, লক্ষ্মী, এনাদেরই পূজায় বড় হয়েছি, তো সেদিক থেকে বাঙালি সংস্কৃতিতে একটা আন্তরিক ফেমিনিজাম আছেই। এর সাথে নিজে নিজেকে একজন “রাধা” হিসেবে দেখতে অস্বস্তি লাগে। তবে ভিডিওটা দেখার সাথে সাথে যেন এই সব মনের অস্থিরতা গুলোও দূর হতে লাগল। ছবিগুলোতে নিজেকে রাধার চরিত্রে দেখতে লাগলাম, আর পুঁচকেটা হয়ে গেল আমার কৃষ্ণ। এ কি আবোলতাবোল? আমি না পুরুষ, আমি না তার গুরুজন? শ্রদ্ধার ডিরেকশন উলটে গেল কি করে? কিন্তু হ্যাঁ তো…বাচ্চার ধ্রিষ্টি যাতে আমার ওপরে পড়ে, তার চেতনাতেই আমি আশাবাদী হয়ে বসে থাকি। যেমন ছাতক বসে থাকে মেঘের বরিশলের অপেক্ষায়ে (লালন)। এই সমস্ত ভাবনা ও চিন্তা গানটা চলার সাথে আমার মনে বিদ্যুতবেগে অনুভব করছি।

১০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত অশান্তি দূর…ধর্ম নিয়ে দলাদলি, লিঙ্গের নামে ভেদাভেদ, নিজের অহংকার ও অস্বস্তি। খুস্রর কবিতা, নুস্রতের তান, বৈষ্ণব ও সুফি মূলভাব কয়েকটি আঁকা ছবি, আর সবচেয়ে বড় আমার ছোট্ট মেয়েটার গোলগাল মুখ…সত্যিকারের অন্তর থেকে আমার ছাপ ও তিলক ছিনিয়ে নিলি রে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s