কুমীর নিয়ে আজব কান্ড

গতকাল খবরে এক বিদ্ঘুটে ভয়ানক গল্প শুনলাম। আমেরিকার সর্বদক্ষিণস্থ রাজ্য ফ্লরিডাতে একজন লোক রাস্তা থেকে একটা জ্যান্ত কুমীর ধরে ওয়েন্ডিজ রেস্টুরেন্টের ড্রাইভ-থ্রু-এর জানলা দিয়ে সেই পশুটাকে ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কান্ডটি হয়েছিল গত অক্টোবর মাসে, লোকটা ধরা পড়েছে কালকে। গল্পটাতে এও শুনলাম, যে বন্যপ্রাণী সরকারি বিভাগ থেকে লোক যখন আসে, তখন তারা তাদের নানা সাঁড়াশি যন্ত্রপাতি দিয়ে কুমীরকে বধ করে তার মুখের ওপর মোটকা টেপ লাগায়ে। তারপরে সেই কুমীরটাকে রেস্টুরেন্ট থেকে বের করে পুকুরে পৌঁছিয়ে দেয়। তার মানে প্রধান অপরাধীটার বুকের পাটা বুঝুন। জ্যান্ত কুমীরটাকে পাকড়ানোটা তো একটা কথা হল (ল্যাজ-ফ্যাজ ধরে যা হোক করে তা না হয় করল), তার ওপরে ওইটাকে আবার গাড়ির পেছনের সিট থেকে মুন্ডু থেকে ল্যাজ অব্দি ধরে নিজের শরীরের ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়ির জানালার বাইরে আরেকটা জানালার মধ্যে গুঁজে দিল। অবশ্য কুমীরটা সাড়ে-তিন ফুট লম্বা, সুতরাং অত বড় নয়। তবে কচি বাচ্চা কুমীরও নয়। একটা কামড়ে মানুষের যেকোনো অঙ্গ ছিঁড়ে নিতে পারে খুব সহজেই। রেস্টুরেন্ট কর্মী যখন তার পেছন ফিরে ঘুরেছিল, তখনই নাকি এই কুমীরটাকে সেই জানালার মধ্যে ঢোকানো হয়। যে অপরাধী, তার বুকের পাটা থাকলেও, সে বেচারা কর্মীর ভয়ের কথা ভাবুন। হঠাত পেছন ঘুরে মাটিতে একটা আস্ত কুমীর। আমি তো ছোট টিকটিকিতে ভয় পাই, আমি হলে হুঁশ হারাতাম। লোকটা (১৮-১৯ বছরের হবে) এবং তার মাবাবারা বলছে এটা নাকি একটা খুবই নিরীহ একটা কৌতুক ছিল। তার বিরুদ্ধে লাঞ্ছনার দোষারোপ আনা হচ্ছে আদালতে। আনা উচিত, এরকম কাজের শাস্তি ভালো করে দেওয়া হোক, যাতে এরকম “prank” কারুর মাথায়ে না আসে।

ফ্লরিডা রাজ্যে আমি অনেকদিন বাস করেছি। যে শহরে এই কান্ডটি হয়েছে, সেখানে আমি ২ বছর কাজের জন্যে কাটিয়েছি। আমাদের কলকাতাও যেমন সুন্দরবনের জলাভূমির ওপর তৈরি, তেমনি বেশিরভাগ ফ্লরিডার দক্ষিণ দিকটাও এভারগ্লেড জলাভূমির ওপর তৈরি। ওখানে লোকসংখ্যা কম, আর তার ওপর উন্নত দেশে মানব-বাসস্থান বাড়ানোর প্রতি অনেক বেশি সতর্ক ও নির্ভুল আইনকানুন আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমতা রক্ষা করার জন্যে। কলকাতার জনসংখ্যা যদি দেড়কোটির জায়গায়ে দেড়-লাখ হত, তাহলে হয়ত কলকাতার রাস্তার ধারে বাঘ-হাথি-কুমীর ইত্যাদি দেখা যেত।

আমার মনে আছে ওই ওয়েস্ট পাম বিচ শহরে থাকাকালীন একটা রাত্রে আমি তেড়ে ভাত খেয়ে রাস্তায়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। রাত্তির ১১টা মতন হবে, নিরিবিলি রাস্তা, ফুটপাথে আর কেউ নেই, রাস্তার আলোও বেশ মিটমিটে আর দূরে দূরে। একটা জায়গায়ে একটা ছোট খাল, তার ওপর দিয়ে অবশ্যই ব্রিজ আছে…হঠাত সামনে দেখি বেশ ৮-৯ ফুট লম্বা সব্জে-কালো একটা কুমীর খাল থেকে বেরুলো। ঘাস কাটিয়ে আমি যে ফুটপাথে, সেটাতে উঠল। আবার ফুটপাথ থেকে রাস্তায়ে নামল, নেমে রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারের ওপরে গিয়ে উঠে বসল। ডিভাইডারে বহু গাছ আর বড় বড় ঝোপ, সেই ঝোপগুলোর মধ্যে গিয়ে কুমীরটাকে আর দেখতে পেলাম না। আমারও বোধহয় মাথাটা একটু খারাপ। সাধারণত টিকটিকি ব্যাং সাপ এগুলোর থেকে এড়িয়ে চলি। তবে ওই মুহূর্তে আমার কৌতূহল আমার ভীরুতাকে পরাজিত করে (একে আমি নিজগুণ হিসেবে মানি, আমার মা ও স্ত্রীর মত অন্য)। আমি ভাবি সত্যিই কি এটা কুমীর? তখন আমি ফুটপাথে এগিয়ে যাই, যেখানটায় কুমীর পথ কেটে গেছিল। গিয়ে ওই ঝোপের দিকে নজর দিই। খানিকক্ষণ বাদে ঝোপে নড়াচড়া শুরু হয়। কুমীর থেকে আমি এখন ১০ ফুট দূরে, যদি সে রাস্তা ফেরত আসতে চায়। ওই মুহূর্তে বোধহয় ভয়ের চেয়েও বেশি আত্মরক্ষার অঙ্ক মনের মধ্যে চলছে। কোন দিকে তিড়িং করে পালাবো যদি আমার ওপর আক্রমণ করে…ভাগ্যিস ওই ঝোপের নড়াচড়ার পরিণতি হল যে কুমীরটা রাস্তার অন্যদিকটা পেরিয়ে অপর ফুটপাথে উঠল। উঠে অন্যদিকের ঘাস কাটিয়ে খালের অপরদিকে নেমে গেল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

সে সময়ে আমি কুমীরের চিন্তাধারাটা বুঝতে পারিনি। ব্রিজের তলা দিয়েই তো যেতে পারত যদি খালের মধ্যে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। তখন আমি ব্রিজের রেলিং টপকে দেখলাম যে ব্রিজটা সত্যিকারের খালটাকে দুভাগ করেছে। দুভাগের মধ্যে জল যাওয়ার জন্যে তিনটে মোটা পাইপ আছে, তবে কুমীর কি করে বুঝবে পাইপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়? তবুও কুমীর জানতই বা কি করে যে স্থলে উঠে এত পথ পেরুলে আবার সেই খালের অন্য ভাগে প্রবেশ করার পথ আছে? এর মানে যে কুমীরগুলো এই রাস্তা পেরুনোটা মাঝেমাঝেই করে থাকে। যত ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে থাকি, ততই যেন বুকে ডর ফিরে আসে। ভাবি, কতবার যে আমি এখান দিয়ে রাত্রি বেলায়ে জগিং করেছি। ফুটপাথে তা না হয় দেখা যায়, তবে ডিভাইডারের ঝোপের ওপর দিয়েও তো কয়েকবার নিজেই রাস্তা পেরিয়েছি। একটা ক্যাঁক করে নিজের ঠ্যাঙে কামড় খেতেই পারতাম ইতিমধ্যে। এ ঘটনার পর থেকে আমি কুমীর নিয়ে খুব সাবধানে চলা ফেরার অভ্যাস শুরু করি ওখানকার বাকি নাগরিকদের মতন।

396899_10151889287340192_484103604_n

ওই ওয়েস্ট পামে থাকাকালীন যেখানে কাজ করতাম, সেটা আরও নিরিবিলি জলাজমিতে তৈরি এলাকায়ে ছিল। ওখানে উপদেশ দেওয়া ছিল যে সন্ধ্যাবেলায়ে কাজ থেকে বেরুনোর সময় পারকিং লটে সাবধানে চলাফেরা করতে। জ্বলন্ত রোদের কারনে নাকি কুমীর আমাদের গাড়িগুলোর তলায় বসে ছায়ায় আরাম করতেই পারে। এরকম জীবনধারা কলকাতার বা ঢাকার বা কোন শহুড়ে লোকের কাছে আজব লাগতে পারে, ভয়ানকও বোধয়। তবে মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও প্রবল। হয়ত দক্ষিণ ফ্লরিডার স্থানীয় বীরপুরুষের মতন আস্ত কুমীর হাথে ধরে পাকড়ানোর সাহস কোনদিন হবে না, তবে টিকটিকির ভয় থেকে আমার উন্নতিতে আমি খুশি।

খবরের লিঙ্কটা এইখানে দিলাম।

http://www.wptv.com/news/region-c-palm-beach-county/loxahatchee-acreage/man-accused-of-tossing-gator-into-wendys-drive-thru-window

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s