স্ট্রেট ড্রাইভ

আজকাল খবরে এই জে-এন-ইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলের কান্ডকারখানা শোনা যাচ্ছে। তার চেয়েও বেশি এই তর্কবিতর্ক ফেসবুকে পরিনত হচ্ছে। আমার ধারনা ইন্টারনেটের এই যুগে নামহীনতা বা অন্তত মুখোমুখি আড্ডা বিনে দিন কে দিন লোক বেশি পক্ষ্যভুক্ত হয়ে পড়ছে, যা হয়ত আবার উলটে বাস্তব জগতে প্রকাশ করছে। মানুষের মধ্যে দলাদলি এক স্বাভাবিক কারবার,  তবে এত বিষাক্ত ও অবারিত দলাদলির বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়া জরুরি। নিজের মত থাকা মানে অন্যের মত বাতিল, এ এক ভয়ানক ফলে পরিনত হতে পারে। আশা করি ভারতবর্ষে কোনদিন সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদির মতন রাস্তায়ে-রাস্তায়ে কাটাকাটি গোলাগুলি না আরম্ভ হয়। ছোট্ট উস্কুনিতেই বিশাল আগুণ জলতে পারে। যারা বাম/ডান ইত্যাদি নিয়ে জড়িত, তাদের মনে রাখা উচিত একে অপরকে এত ঘৃণা করলে দুয়েরই ক্ষতি। মনে থাকে যেন ভারত উপমহাদেশের দেশভাগ আমাদের দাদু-দিদাদের জেনারেশনেই হয়েছিল, অর্থাৎ জীবিত স্মৃতির মধ্যেই…

এই বিষয়টি নিয়ে আমি লিখব কি লিখব না, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে এদিক ওদিক করছিলাম। নিজের মতটাই বা কি, ঠিক ধরতে পারছিলাম না। গত পরশুর অনুপম খেরের ইন্টার্ভিউ পরে বুঝলাম ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়িয়েছে।

http://blogs.timesofindia.indiatimes.com/the-interviews-blog/why-shouldnt-we-challenge-calls-for-indias-ruin-umar-khalids-playing-muslim-card-intolerance-is-an-anti-modi-ploy-anupam-kher/

আপত্তি নিলাম, কারন প্রথমেই ভদ্রলোক বলছেন “আমি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসি, তবে দেশকে গালাগাল দেওয়া চলবে না।” তাহলে আপনি সে মতপ্রকাশের ব্যাক্তিগত অধিকারের বিশ্বাসি নন! ২১এ শতাব্দী বলে এ নিয়ে কেবল “lip service” দিতে হয় বলে এটা দিলেন। এইটি পড়ে আমার মাথায়ে এল ইয়েদের কথা, যারা বলে “আমাকে অপমান কর, আমার আপত্তি নাই…তবে আমার নবীজিকে নিয়ে কথা তুললে আমি গলা কেটে দেব।” সব কিছুকে প্রশ্ন করা, এইটি একটি মানুষের অধিকার বলে আমি মানি। মাসে মাসে আমি কেন খাজনা দি? এ প্রশ্ন করা মানে নয় যে আমি খাজনা দেওয়ার বিরুদ্ধে। আমাকে বুঝিয়ে দাও, যে আমার খাজনা দিয়ে রাস্তাঘাট ইত্যাদি সব চলে, ঠিক আছে, বাত খতম। এ প্রশ্ন আমি নৈতিকতার মধ্যেও আনি (কোনকিছুকে পবিত্র মানি না)। অন্য লোক যখন ঘুমোয়, তখন আমি কেন তার সে মুহূর্তের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার ঘরে ঢুকে জিনিশপত্র চুরি করব না? আচ্ছা, কারন এরকম সমাজ হলে সবাই বেঘুমে এক সপ্তাহে মারা যাবে। সুতরাং আমি কোন জিনিশকে ঠিক বা ভুল বা গুন বা পাপ মুখের ওপর মানতে রাজি নই। ন্যায় ও অন্যায়, এগুলি দুই মানুষের মধ্যে এক চুক্তি। ভারত বা কোনও দেশ বরবাদি কেন হবে না, এর জন্যে এক যুক্তি থাকা প্রয়োজন, শুধু বললেই হবে না যে “এ বিষয় নিয়ে তুমি মত প্রকাশ করতে পারবে না।” তুমি কে হে?

আমার কাছে ইন্ডিয়ার প্রয়োজন প্রতীত ইতিহাস পড়ে। ভারত উপমহাদেশ, হিমালয় পাহাড় ও ভারত সাগরের মাঝে। মানব সভ্যতার এক প্রাচীন ও ধনশালী অঙ্গ। যুগের পর যুগ সে নানা রাজা-রানিদের অংশে বিভক্ত। এর কারনে এই উপমহাদেশের বাহিরের পশ্চিম/মধ্যম এশিয়ার নানা উপজাতিরা আগ্রহী হয়ে ফন্দি পাকাতো, কবে ওই ধন আমরাও ভোগ করতে পারি।  তারা একবার ভেতরটা দখল করতে সফল হয়ে গেলে নিজেরাও ভোগের লোভে দুর্বল হয়ে পড়ত, আগামী উত্তরপশ্চিম উপজাতির হাথে। ১৭৫৭এর পূর্বের ইতিহাস কেবল এই একই নাটক, বিভিন্ন নামে। তাও বোধয় এ নাটকে তেমন ক্ষতি হত না। অতএব নতুন কত্তারা মাটির ফসল ভোগ করে সেই মাটিতেই আবার বিস্তার করত। আঙ্গাস মাডিসন নামের এক বিখ্যাত অর্থবিজ্ঞানী দেখিয়ে গেছেন তাঁর কাজে যে ১৮ই শতাব্দী পর্যন্ত ভারত ও চিন বরাবর পৃথিবীর সমস্ত ধনী এলাকা ছিল। এ কথা মনে রাখা দরকার যে আর্থিক ভাবে মানুষ খুশি হলে সে অন্য কাজে মন দিতে পারে, যেমন দেহচর্চা, সংগীতচর্চা, ধর্মচর্চা, ইত্যাদি…যার কারনে ভারতীয় সভ্যতা আর সংস্কৃতি বলতে আমরা ওই ১৭০০র আগে যা উন্নয়ন হয়েছিল, তাই মনে করি। যেই আর্থিক ক্ষমতা হারাতে লাগল, তেমনি এই ক্ষেত্রেও ধন হারাতে লাগল (ব্যাতিক্রম আছে, রবিঠাকুর ভক্ত যেন লাথি না মারে আমাকে)।

এ সব তো সমস্ত ভারতীয়ই জানে। ব্রিটিশ আমল ভারতের ওপর এমন ভাবে গেল, এর উল্লেখ এবং প্রতিক্রিয়া বোধয় ইহুদিদের হলকস্ট পরযার পরের চিন্তাধারার সাথে করা যায়। “Never again” নারা দিয়ে তারা ইজ্রাএল দেশ গড়ে ফেলল। এমন কঠিন অভিজ্ঞতার পরে মানুষ নতুন করে তার পরিস্থিতিকে বিস্লেশন করে, এবং নতুন সিদ্ধান্ত নেয়। যে জাতি হাজার হাজার বছর ধরে সন্তুষ্ট ছিল নানা দেশে বাড়ি বানিয়ে ব্যাবসা আর বিজ্ঞানে জুড়ে থাকতে, তারা শেসে বাধ্য হল এক দেশ গড়তে। একই ভাবে ইন্ডিয়াও তৈরি হয়েছে এরকম করে, ইতিহাসের অভিজ্ঞতার কারনে। সে পথেও তো ভেতরে কাটাকাটি রক্তারক্তি হয়ে গেল, পুর ভারতটা ঈন্ডিয়া হয়নি। তাও যতটা আছে, এইটি ভারতের লোকের পক্ষ্যে এক উন্নতি।

এই কৃষ্ণ কানহাইয়ার ভাষণ শুনলাম। একদিকে শ্রী আমবেদকরের জয়জয়কার, জিনি এই ইন্ডিয়া গড়ার এক প্রধান অভিনেতা। আবার অন্যদিকে বলছে “আজমাল কাসাব ও আফজাল গুরু আমাদের শহিদ, ভারত কি বরবাদি।” ব্যাপারটা কি হচ্ছে? জাদবপুরে কাশ্মীরের “আজাদি” আর মনিপুরের “আজাদি” নিয়ে লোকে নারা লাগাচ্ছে। এ স্লোগান দেওয়ার অধিকার আছে অবশ্যই, তবে এরা কি ইতিহাস পড়ে না? ওদের কি ইচ্ছা ভারত উপমহাদেশে ৫০টি রাষ্ট্র বানালে মানুষের উন্নতি হবে? এই ২১এ শতাব্দীতে বাকি উন্নত পৃথিবী চলেছে মিলনের পথে, আর এরা কি চাইছে? বেশ তো, ইন্ডিয়া অভিযানটি ব্যর্থ ছিল, ভেঙে দাও। ওই ওপরের জি-ডি-পির চার্টে যেটুকুনি উন্নতি হয়েছে, আবার যাবে, আর কি? ভুলে যাও গান্ধি, আমবেদকর, আজাদ, নেহেরু, যাদের আত্মত্যাগে এই ইন্ডিয়া আজকে টিকে আছে, ভুলে যাও ইস্রর গর্ব। সবাই নিজের করে একটি জাতি/ভাষা/গত্র-র নামে একটি রাজত্ব বানিয়ে পরমানন্দে থাক। আর এখন ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের আর্মস-রেস? তখন হবে দক্ষিণ কলকাতা-উত্তর কলকাতার আর্মস রেস। কি মজা। ইন্ডিয়ার বামপন্থীরা ডানকে প্রতিরোধ করতে করতে নিজেরা যে কি না কি ধরনের ভয়ানক প্রগতিবিরোধি চিন্তাধারাদের মাথায়ে তুলে ধরছে, তার দৃষ্টি বোধয় হারিয়ে  ফেলেছে। তার সাথে হারিয়ে ফেলেছে ভারতের মানুষের উন্নতির চিন্তা। “ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন”এর মতন এক প্রগতিশীল ভাবাদর্শের ভার তারা নিজেরাই কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছে (আর এখন তার ভার নিয়েছে অনুপম খের আর বাকি বজ্রং দল জোকার-গুষ্টি)।

ইন্ডিয়ার রাজনীতি বহু বছর ধরেই এক ঘোরের মতন চলছে। অখন্ড ভারতের নাম আজকাল একটি “হিন্দুত্ব” আর “ডানপন্থী” আন্দোলন, যদিও নেতাজি বোস সফল হলে জিন্নাহকে ফায়ারিং স্কুয়াডের সামনে আনতেন। পুরানো কথা, দেশভাগ, ইত্যাদি নিয়ে মাথা আর ঘামানো কোন ইন্ডিয়ানের পক্ষে আর পোষায় না। তবে স্বাধীনতার পূর্বের কথা যখন মাঝে মধ্যেই এই কৃষ্ণ কানহাইয়া-টাইপরা তোলে, তাহলে সবারই সে অধিকার আছে। তখনকার আর-এস-এস/হিন্দু মহাসভারা ব্রিটিশদের পাচাটা, মানলাম। তবে তখনকার কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট কি আর এখনকার সাথে মেলে? নেহেরুর মতন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ তাঁর নাতির শাহবানো কেসের কান্ড দেখলে বমি করতেন। আমার মতে এই সব স্বাধীনতার আগের কথা তুলে ব্ল্যাংকেট স্টেটমেন্ট ছাড়া অসৎ। তখনও ইন্ডিয়া গড়ে ওঠেনি। সবাই যে যার নিজের কল্পনা অনুজাই ব্রিটিশদের পা চাটছিল। সেরকম ভাবে দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে ভ্রাতিত্বের ধারনাই ছিল না। এমন করলে সবার মধ্যেই দোষ আছে। আমেরিকাতেও দেখা যায়, যে রিপাবলিকান দল ১৫০ বছর আগে সংখ্যালঘু এবং বন্ধী আফ্রিকান-জাতির মানুষের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মশাল ধরেছিল। সে সময় ডেমক্রাটরা ছিল ইউরপিয়-জাতির মালিকদের দল। ইতিহাসের কুখ্যাত কু ক্লাক্স ক্ল্যানের অনেক নেতারা দিনের বেলায়ে ডেমক্রাট দলের নেতা ছিল। আজকে ঠিক উলটটা হয়ে গেছে। বারাক হোসেন ওবামা হলেন ডেমক্রাটদের, আর ডনাল্ড ট্রাম্প হল রিপাবলিকানদের। এই উদাহরনে এটাই বোঝা যায় যে রাজনীতি এক অদ্ভুত জিনিস। এতে দলগুলোর নাম কেবল নামই। আসলে দেখতে হয় এ মুহূর্তে কোন নামের দল প্রগতিশীল বা পশ্চাদমুখি চিন্তাধারা নিয়ে চলেছে। ইন্ডিয়ার দুর্ভাগ্য যে তাঁর কোনই আর ১০০% প্রগতিশীল দল নেই। স্বাধীনতার পর পর বোধয় ছিল, এখন ফুরিয়ে গেছে।

কিছু এডিট দিচ্ছি, যাতে লোক আমার মত ভুল না বোঝে। গোটা ভারতবর্ষে বহু সামাজিক সমস্যা ছিল এবং আছেও। এ সমস্যা মানসিক, এর সমাধান কোন ১-শটে হবে না (যেমন লোকে বলে “education” হলেই নাকি সবাই খুব সৎ মানুষ হয়ে যাবে)। এধরনের বাক্তাল্লাহতেও সে একই সমস্যাটা প্রকাশ করে, যে মানুষ ইস্কুলে পড়াশুনা করলে তার চরিত্র ও মন উন্নত হবে। একদিক থেকে দেখলে এটাও একধরনের বৈষম্য বর্ধিত করে। জাতিভেদের স্বীকার যারা, বা ইন্ডিয়ার সরকারের হাথে “colonial” আচরণে যারা বন্ধী, তাঁদের অবশ্যই দাবী আছে। ইন্ডিয়া একটা দেশ বা একটা সরকার যদি হয়েই থাকে, সেটার মূল কারন যা নিয়ে আমি ওপরে উল্লেখ করেছি (আন্তর্জাতিক মাত্রায়ে কড়া হওয়া যাতে ফের কেউ এধরনের শাসন না করতে পারে)। এর মানে নয় যে এবার কখগ জাতের মানুষ বাকিদের শাসন করবে । যেহেতু ব্যাপারটা তাতেই পরিনত হয়েছে ৭০ বছর বাদে, তাহলে এই কথাটি সেই নির্যাতিত মানুষদের একটা ন্যায্য দাবী যে তারা কেন মুখ বুজে এই ইন্ডিয়াটা সহ্য করবে? যে সম্মান ও উন্নতি আমরা ব্রিটিশ আমলে হারিয়েছি, সে সম্মান মানুষ কি করে AFSPA ধরনের আইনের জুলুমে ফেরত পাবে? তাই বলে দেশ ভেঙে দাও বা বিভিন্ন রাজ্যের আজাদি? তাঁদের বেদনা আমরা হয়ত বুঝি না, কিন্তু তাঁদের ওপর আঘাতটা সকল ইন্ডিয়ানের ওপর আঘাত, তাঁদের ব্যাথা বাকি সমাজের লজ্জা। “Of the people by the people for the people”, “some people” নয়। এইটা সবার মনে রাখা উচিত। যারা সমাজে ক্ষমতার স্থানে আছে, তাদের ওপর দায়িত্ব বেশি, কারন ওরাই এত বছর স্বাধীন দেশের রাজত্ব ডুবিয়েছে। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের বোঝার সময় যে দেশটা ওদেরই। মানুষের মানুষ হওয়ার অধিকার কেউ ওপর থেকে দান করে না, এগুলো তারই হাথে। যে প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে সে অধিকার রক্ষার জন্যে, তার বরবাদি চাওয়াটা নিজের গোলপোস্টে গোল মারা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s