ভাঙ্গা মন

হায়রে আমার কলকাতা। তোকে ছাড়া যেন এক যাযাবরের মতন সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াই। ২ বছর এখানে, ৩ বছর ওখানে। এই করে অনেক জায়গাকে পর্যটকের চেয়ে ভালো করে শিখেছি, তবু কোথাউকার বাসিন্দা হয়ে উঠিনি। মন যেন চায় না তা হতে। প্রত্যেকবার নিয়ম করে কিছু মাস বাদে জায়গাটা একঘেয়ে লাগবেই লাগবে। আমি নিজেকে লক্ষ্য করে দেখেছি, অনেকটা ব্যাটারির মতন। কলকাতা গিয়ে রিচার্জ না হলে বোধয় ছটফট ছটফট করি ভেতরে। আশেপাশের সবাইকে হয়ত একটু বিরক্তও করি। আর গিয়ে কি খুশি। কলকাতায় যেন full formএ আসি। তখন হুমড়ি খেয়ে দিনে ৭-৮টা ১০০ গ্রাম মিষ্টি দই সাঁটাই, রাস্তায়ে ৪০টা ফুচকা খাই। আর এবার তো লোক আমাকে রাস্তাঘাটে ঠিকানা পরিচয় জিজ্ঞেস করল। কি আহ্লাদ কি আহ্লাদ! এতদিন ধরে আমেরিকার বাঙালি গোষ্ঠীগুলোতে কিরকম আড়ালে আড়ালে থাকতাম। কে জানি কেন। আমার কিশোর বছর যে কেবল আমেরিকাতেই নয়, তবে আমেরিকার তুলনাতেও এক অতি ফরোয়ার্ড জায়গাতে (মায়ামি, ফ্লরিডা) কাটিয়েছি, এর ছাপ আমার মধ্যে অনিবার্য। সুতরাং এইরকম জিনিশের দিক থেকে আমি সেই মেল-বন্ডিংটা সমবয়সী বাঙালি ছেলেদের সাথে পেরে উঠি নি আমেরিকাতে। কিন্তু মনে হয় আজকাল ভারতের নাগরিক অনেকেই, বিশেষত আমার প্রজন্মের, দেখছি নিজের দেহের দিকে লক্ষ্য রাখছে। আমেরিকাতে সাধারন পুরুষমানুষ দৌড়ঝাঁপ, পুশাপ ইত্যাদি অন্তত করে। জীবনসাথি জোগাড় করাটা নিজের ঘাড়েই পড়ে, বাবামায়ের নয়, সুতরাং এই ফ্রি মার্কেটে নিজের শারীরিক সৌন্দর্যও একটি সম্পদ (পড়াশুনা, পয়সাকড়ি, এদের পাশাপাশি)। আজীবন রসগোল্লা খাব, ২ কিলোমিটার হাঁটতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে, মারিয়া শারাপোভার ছবিকে পুজো করব, আর পছন্দের মেয়ে দেখলে তাকে আড়াল থেকে ভিতুর মতন থাকব, এসব চলে না। আমেরিকাতে চলে না, ভারতেও বোধয় এখন ওই ৯০ লাখ বেশি ছেলে মেয়ের চেয়ে বলে সেই চাপে এখন ফ্রি মার্কেট তৈরি হচ্ছে। ভালো, তা হোক। এখন কলকাতায়ে গেলে লোকজন রাস্তাঘাটে বিদেশি বা প্রবাসী আর ভাবে না আমাকে নিয়ে। পাড়ার দাদা/মস্তান মতন লাগে মনে হয়।

যাই হোক, কলকাতায় এবার গিয়ে একদিন কলেজ স্ট্রিটে গিয়েছিলাম বাঙলা বইয়ের ধান্দায়ে। মেট্রোয়ে গেলে সেন্ট্রাল বা মহাত্মা গান্ধি রোড স্টেশন যে কোনতেই চলবে। আমি গেলাম মহাত্মা গান্ধি রোড অবদি। আমি জানতাম সেখান থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে গেলেই বইপাড়া পাব। তাও মেট্রো থেকে বেরিয়েই উল্টো দিকে হাঁটা দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে যখন বিবেকানন্দ রোডে পড়লাম, তখন বুঝলাম উল্টো দিকে হেঁটেছি। এটা মাত্র ১০ দিন আগের কথা। তাই বলছি। যতদূর মনে পড়ছে, বিবেকানন্দ রোডে আমি একটা অসমাপ্ত ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে নীরবে হাঁটছিলাম। গতকালের খবর শুনে একটা ভয় আর আঘাত তো মনে লেগেছেই। ওই ভয়ানক ভিডিওটা যতবার দেখি, ততবার ইচ্ছে করে সেই নিরীহ গাড়ি ও অটোদের বলতে পালাও, কিন্তু তারা কিছুতেই পালাচ্ছে না। ভিডিওটা দেখলে মনে হয় সেখানে আমিও হতে পারতাম, সেখানে তুমিও হতে পারতে। আসলে সকলেরই মনে হওয়া উচিত, যে ওটার তলায় আমরা সকলই ছিলাম।

দোষ এখন কার ঘাড়ের ওপর চাপবে? অথবা কার ঘাড়ের ওপর চাপালে সকলে খুশি হবে? আমি এবার গিয়ে কিছু জিনিশ লক্ষ্য করেছি, যা নিয়ে নিজের মতামতটা জানাব এখানে। ট্যাক্সিওয়ালা থেকে খাবারের দোকানের লোক, সবার মুখ থেকে শুনলাম রাস্তাঘাটের উন্নতির পেছনে যে পয়শা খরচ করা হচ্ছে, সেগুলো সারদা-নারদা ইত্যাদি চুরির টাকায়। কথাটা যে কত লেভেলে ভুল, সে আর কি বলব। চুরি করা টাকার কিছু অংস দিয়ে যদি রাস্তাঘাট তৈরি হয়, তাহলে খারাপ কি? পুরোটাই পকেটমার হয়নি, এই ভালো। জনগণের পরিশ্রমের মাইনের খাজনা দিয়ে জনগণের সরকার রাস্তা মেট্রো ব্রিজ ইত্যাদি বানাবে না তো কি করবে? আমার মনে হয় ৭০ বছর বাদেও সরকার যে জনগণের চাকর, এ কথাটি এখন অবদি লোকের মনে ঠিক মতন বসেনি। সমস্ত “নেতা” নিজেকে এলাকার রাজারানি হিসেবে চলাফেরা করে, আর এ চলাফেরা মানুষ নির্বিকারভাবে সহ্য করে। এখন এই ফ্লাইওভার ভাঙ্গা নিয়ে মমতার ওপর দোষারোপ লাগানো হবে এক পক্ষ্য থেকে যে সে নির্বাচনের আগে কাজে তাগাদা লাগিয়েছিল বলে এ অঘটন ঘটল। এর থেকে আমাদের হতাশ জনগণ কি বুঝবে? যে সময় মতন কাজকম্ম হয়ে যাওয়াটা আশা করা অনুচিত? একদিকে একজনরা ৩৫ বছরে কিচ্ছু করেনি। আরেক দিকে ৫ বছরের আমলে কোন কাজ না করে জনগণের টাকা পকেটমার করে নির্বাচনের আগে লাস্ট মিনিটে তাগাদা দিয়ে ধুমধাম জিনিশ ভেঙে পড়ছে। এরকম করে বিধ্বস্ত মানুষের মনকে আরই হতাশ করা হবে। নিজের নির্বাচিত সরকার ও নেতৃত্ব যে নিজের সেবা করবে, সে অনুমান তো বহুকাল ভাঙা হয়ে গেছে, কিন্তু তা গড়ার কোনদিন কি উৎপাদন হবে? এরকম করে চললে কোনদিন হবে না। এর চেয়েও বিফল করে যখন সাধারন মানুষ বলে সুনিশ্চিতভাবে যে এবার তৃনমূল জিতবে, যেমন এইটি ভাগ্যে লেখা আছে। নিজেরা কট্টর বামপন্থী হলেও এরকম করে বলার কোন মানে হয়? এত সব বুঝি না গো। সিস্টেমটা আছে, যাতে লোক যদি কাজ ঠিক মতন না করতে পারে, তাহলে তাকে দোহাই দেব ৫ বছর অন্তর। আমার কাজে এখানে একটা ছেলে তামিল নাডুর থেকে। সে ভাবতেই পারে না যে এক জনসংখ্যা যুগের পর যুগ একই দলকে সমর্থন করে যাবে। আমার মনে হয় এ নির্বাচনে অন্তত কলকাতা শহরে যত বিধান সভা সিট আছে, ওগুলোতে নাইবা তৃনমূল নাইবা কাস্তেহাথুড়িহাথের জেতা উচিত। শুনলাম সেদিন ওইখানে যখন তৃনমূল আর বাম নেতারা হাজির হল, তখন “সব চোর হে” স্লোগান ভিড় থেকে উঠেছিল। এ রাগটা থাকা দরকার, কিন্তু এটা আরও হতাশায়ে পরিনত হওয়া উচিত নয়। সময়ের মধ্যে সামাজিক কাজকম্ম সারা উন্নত দেশে হয়ে যায়, ভারতেও কিন্তু এইরকম কখনও শুনি না গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে হতে। দেশপ্রেমিক ও সমাজসেবক নেতৃত্ব না হলেই এমন হয়। নরেন্দ্র মোদী একা দিল্লিতে বসে সব সুদ্রতে পারবেন না। সৎ এবং সক্ষম মানুষ ভারতের ওলিতে গলিতে আছে। তাদের নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে, সফল হতে হবে। এরকম হতাশ আর চলতা হে বললে কোনদিন সুদ্রবে না কিছু।

আমার বরাবর আশা থাকবে, যে কলকাতা একদিন নিউ ইয়র্ক টোকিওদের শ্রেণিতে ফের পৌঁছবে। সেই গতিশীলতা কলকাতার মানুষের দৈনিক জীবনযাপনে আমি দেখতে পাই, অনুভব করি। এরকম হতাশ ও অক্ষম মনোভাব কারুর পক্ষেই প্রাপ্য নয়, বিশেষ করে আমার রিচার্জ স্টেশনের।

এইখানে একটা লিঙ্ক দিচ্ছি, দেখাতে এখন কি চিন্তাধারার নেতৃত্বের তলায় বাস করলে কিরকম আরশোলার মর্যাদায় জীবন মানতে হয়। এটা পড়ে রাগ ছাড়া আর কিছুই মনে আসা উচিত নয়। কিন্তু রাগের পর কি?

http://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/West-Bengal-government-fails-disaster-test-rescue-operation-begins-late/articleshow/51640181.cms

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s