ইংরেজি মেশানো কথিত বাঙলা এবং তার ফলাফল

আমেরিকাতে সাফল্যভাবে সমাজে অঙ্গীভূত হওয়া নিয়ে অনেক অভিবাসীর মনে নানাধরনের ধারণা থাকে। আমার ধারণা হচ্ছে যে সমস্ত নাগরিকেরই দুটি ছদ্মবেশ গড়া জরুরি। এক হচ্ছে প্রচলিত জগতের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে জুড়িয়ে নেওয়া, দ্বিতীয় হচ্ছে নিজের আন্তরিক একটি “ঘর” গড়ে তোলা, যে ঘরে আমিই একা রাজা/রাণী, যে ঘরে আমাকে কেউ টপকাতে পারবে না। এ ঘর সংস্থাপিত না করলে আমার মনে হয় সে ব্যাক্তির সম্পূর্ণ মনের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে, এবং এক ধরনের বিষাক্ত ভাব সে ব্যাক্তির মনে বিস্তারিত হয় যেইটি তার প্রচলিত (এক নম্বর) জগতেও প্রকাশ করতে পারে। বিপরীতে, অন্তরে নিজেকে গড়ে উঠলে বাইরে যতই অপমান বা অবিচার ভোগ কর না কেন, এক ধরনের মুচকি হাঁসি থাকবে মনের মধ্যে।

যে বাঙালি বাবামায়েরা নিজেদের বাচ্চাদের আমেরিকার সমাজে পালন করছে, এবং সে শিশুদের বয়স এখনও অল্প, তাদের কাছে আমার কিছু মতামত বলি। এ কথা বাঙালি-অবাঙালি মেশানো ঘরের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। বাঙলা ভাষায় সে শিশুকে এক্কেবারে বাকপটু করুন। সে বাচ্চা যতই আপনার মতে দেশের বাঙ্গালিয়ানার থেকে সরানো থাকুক না কেন (ওই তৃনমূল-সিপিমের মারামারি, বা বাংলাদেশিদের রাজাকার-আওয়ামির মারামারি, ওই ব্যাঙ্কে ঘুস না দিলে নিরুপায় হওয়া, ওই পলিউশনের ধোঁয়া, ইত্যাদি), সে বাচ্চা তার বাকি বাস্তব সমাজের কাছে কিন্তু একজন বাঙালিই। এর মানে নয় যে তার সেই বাস্তব সমাজ তাকে আমেরিকান হিসেবে মানে না। আমাদের আমেরিকান হওয়া মানেটা কি, সে ধারনা খুব ভালো করে বোঝা উচিত। আমেরিকান মানবে, তবে সমাজ তাকে নিজেদের সাদা বা কালো বা হিস্প্যানিক জাতিদের মধ্যে কোনদিন মানবে না, সে বাচ্চা আর্ধেক অবাঙালি অভারতীয় জাতির হলেও। এইটাই বাস্তব। এইটি হচ্ছে সে শিশুর অতিরিক্ত একটি বৈশিষ্ট্য। ক্লাস ১২ পর্যন্ত আমেরিকার বাচ্চারা একটি খুবই শ্রেণীবিভেদহীন জগতে চলাফেরা করবে, তাদের বাবামায়ের যতই শিক্ষা ও মাইনে হোক না কেন। এর নিন্দা আমি কোনদিনই করব না, কারন শ্রেণীহিসাবে ভিন্নভাবে বড় হওয়াটাও মানুষের পক্ষ্যে ক্ষতিকর (ভারত বা বাংলাদেশে যেমন স্বাভাবিক)। তবে আপনার ওয়াইট-কলার কর্পোরেট জগতে যে অশোধিত আচরণের থেকে আপনি মুক্তি পান, সে বিকল্প আপনার শিশু অন্তত ক্লাস ১২ অব্দি (অতএব ১৭-১৮ বছর বয়স) পাবে না।

সুতরাং এই বৈশিষ্ট্যটি গড়ে তোলা উচিত। সে যেন সোমান তালে বাঙলায়ে কথা বলতে পারে, বই পড়তে পারে, ডাইরিতে লিখতে পারে। এ বাঙলা ভাষা যেন তাকে তার নিজস্ব “জাতি”র সাথে মিশিয়ে দিতে পারে। দেশে গিয়ে হারিয়ে গেলে সে যেন পানের দোকানদারের কাছ থেকে রাস্তার সন্ধান পেতে পারে। এইগুলোতে সে এক আনন্দ ভোগ করবে। এ ভাষা না জানলে কিন্তু তার ভুবনে এক কঠিন পরিচয় সঙ্কট সৃষ্টি হবে। সে তার আমেরিকার-সমাজ-আনুসারিক-বরাদ্দ জাতির সাথে যদি ভিন্নবোধ করে, তাহলে সে আজীবন এইটি নিয়ে লড়াই করবে। বাড়ির চাপে সে হয়ত তার পড়াশুনা ঠিক মতন করে নেবে, কিন্তু বড় হয়ে তার এক জাত-ভিত্তি হীনমন্যতা গড়বে।

এ বিষয়ে কিছু গবেষণা করেছি, যে কিভাবে বাংলাভাষাটি বাচ্চা শিখবে আমেরিকায় বড় হয়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাড়িতে কেবল বাঙলায় কথা বলা। যদি স্ত্রী বা স্বামী অবাঙালি হন, তাহলে তার সাথে ইংরেজি চলবে, কিন্তু বাচ্চার সাথে কেবল বাঙলা। বাচ্চা ইংরেজিতে আপনার সাথে কথা বললে ভান করুন না বোঝার। এইগুলি আমেরিকার পিডিয়াট্রিসিয়ান জার্নালের চর্চা (আমেরিকাতে এখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চেষ্টা চলছে তাদের নতুন প্রজন্মদের বহুভাষী হিসেবে গড়ানোর, এগুলোতে মাথার মগজেরও উন্নতি আছে), আমার নয়। শনিবার রবিবার বাঙলা ক্লাস করা যায় এক-দেড় ঘন্টার, যে ক্লাসের নিজস্ব হোমওয়ার্ক হবে। অ-আ-ক-খ ১-২-৩-৪ থেকে শুরু করে, নিজেকে বাঙলা ভাষার বক্তা থেকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের কলকাতার উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইংরেজি-মিডিয়ামে পড়া কথিত বাঙলার যা ইংরেজি মেশানো খিচুড়ি অবস্থা, সেইটাকে চরম চেষ্টা করে ত্যাগ করতে হবে। সাধারন কথাবাত্তায় আমরা যে পরিমাণে ইংরেজি মেশাই, এতে এক বাচ্চার বাঙলা শেখা অসম্ভব। এক উদাহরন দি, “এই গুলু, লিভিং রুমের লাইটটা অফ করে দিয়ে আয় তো।” এ বাক্যে আছে living room, আছে light, আছে off। এই বাক্যটির বিষয়গুলো কিন্তু এমন বস্তু নয় যেগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি বা পরিভাষার সঙ্গে জড়িত (ধরুন কম্পিউটার, আইফোন, কুয়ান্টাম মেকানিক্স, ইত্যাদি)। আমরা খুব সহজেই বলতে পারতাম, “এই গুলু, বসবার ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে আয় তো।” কিন্তু আমরা সেটা বলি না। সেইটি কলকাতায় করলে চলে, কিন্তু বিদেশে এতে আটকে গেলে নতুন প্রজন্মের বাঙলা শেখা হবে না। চরম আবেগ অনুভব করলে সে ভাব বাঙলা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে জানা চাই, কারন আমরা সম্পূর্ণভাবে সেইটি ইংরেজিতে কিন্তু করতে জানি, কিন্তু বাঙলাতে করতে গেলে ইংরেজির সহযোগিতা আমরা নিই। মনের আনন্দ বা রাগ যদি বাঙলায়ে প্রকাশ করতে কোন বাঙালি না পারে, সেইটা আমার মতে খুবই দুঃখজনক। এই দিচ্ছি আমি ঋতুপর্না সেনগুপ্তের বক্তৃতা এবিপি আনন্দা চ্যানেলের আলোচনায়ে, দেখুন দুএকমিনিট কিভাবে মনের কথা বাঙলায়ে বলতে অসুবিধেবোধ করছেন

প্রথমে শুরু করলেন ভালো করেই (এই ভাল/খারাপ বাঙলার বৈপরীত্যটিও আমি আপত্তি করি…ইংরেজি ভাষায় ভাষণ শুধু ১০০% সম্পূর্ণ ইংরেজিতে বললেই কিন্তু সে ভাষণ “ভালো” হয়ে দাঁড়ায় না), কুণ্ঠাবোধ শব্দ ব্যাবহার করলেন। ওইটি হয়ত আগে থেকে প্রস্তুত করে এসেছিলেন। কারন তারপর থেকে interesting, optimistic, instinctive, comparison, positive, ইত্যাদি, এমন সব ইংরেজি চলা আরম্ভ হল, যে আমার মনে খটকা লাগল, যে সত্যিই গো, এরকমভাবে বাঙলায়ে বাড়িতে কথা বললে বাঙলাভাষাটা বিদেশে বড় হলে কেউ শিখবে না। আমি আজকাল অসাধারণ প্রয়াস করছি, আমার লিখিত বাঙলার পর্যায়ে আমার কথিত বাঙলাকে ওঠাতে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা বাকি বাঙালি বন্ধুবান্ধব এমন কি নিজের আত্মীয়স্বজনদের সাথে এরকম বাঙলায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করি, ঠিক কি না? “Old-fashioned” লাগে? না কি লোকে ভাববে “ব্যাটা পোঁদ-পাকামি করছে তো, নিজেকে কি একটা পণ্ডিত মনে করে”। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা কোনটাই নয়। আবার অন্য ভাষার সাথে তুলনা করি, ইংরেজিতে কেউ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে কথা বললে কেউ তাকে old-fashioned বা পণ্ডিতি-মারা ভাবে না, তাহলে বাঙলায়ে কেন? লজ্জা পাওয়া নিয়ে শুধু এইটুকুই বলব, আপনার “ভালো” বাঙলার প্রধান গ্রাহক হবে আপনার শিশু, যার জীবনে এর থেকে কেবল সুবিধাই সুবিধা…তারপর বাকি সবাই কি ভাবে বা না ভাবে, কি যায় আসে?

কথ্য বাঙলায়ে ইংরেজি ত্যাগ করলেও কিন্তু পথ কঠিন। সারাক্ষণ একজন গুরুজন ছোটোর সাথে বাঙলায়ে কথা বললেই শেখানোতে সঙ্কট থাকবে। সে গুরুজন আরেকজন বড়োর সাথে বাঙলায় দৈনন্দিন কথা শোনার সম্ভাবনা না থাকলেও আপনি বাড়িতে বা গাড়িতে বাঙলাভাষায়ে দুনিয়ার খবরাখবর শুনতে পারেন। এর সক্ষমতারও এক সীমা আছে, অন্তত যতদিন পর্যন্ত বাচ্চা বাঙলা বুঝতে পারছে না আর সে যে পৃথিবীর উল্টো কোনায় বড় হচ্ছে, তার অনুভব করতে পারছে না। কারন হচ্ছে যে বাংলাভাষার চ্যানেলদের আন্তর্জাতিক পদচিহ্ন খুবই কম। এই যে এবিপি আনন্দা বা ২৪ ঘন্টা, এরা একেবারে পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক। আমি ওদের ওপর এই অঞ্চলকেন্দ্রিকতা নিয়ে আপত্তি করছি না, কারন ওদের নিজস্ব দর্শকব্রিন্দ তাই দেখতে চায়, তবে আমিও গাড়িতে চলাকালীন কতক্ষণ আর শুনব দার্জিলিঙের চাবাগানের পোকার কথা? পৃথিবীর সমস্ত সংবাদ বাঙলায় পেশ করার আছে কি কেউ? আমি বাংলাদেশি বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম বিবিসি বাঙলার কথা, কিন্তু এদেরও কিন্তু একেবারে বাংলাদেশকে ঘিরে কথাবাত্তা, হয়ত দুএকটা আন্তর্জাতিক বড় কান্ড বিবরণ করবে, কিন্তু গভীর আলোচনা বাংলাদেশকে ঘিরেই। এইগুলোরও মূল আছে, কিন্তু শুধু এতেই সীমাবদ্ধ আছে আমার বাংলাভাষার খবর ও আলোচনার জগত। তাতে আমার পক্ষে বাঙলা শেখানোটা শক্ত হয়ে পড়ছে। আবার, অন্য ভাষার সাথে তুলনা করব, যে ভাষা ইংরেজি নয়। আপনি চাইলে আপনি পুরো অলিম্পিক্সটা আরবি বা স্প্যানিশ বা ফ্রেঞ্চ বা চিন বা জাপানি ভাষায় শুনতে ও দেখতে পারবেন। কিন্তু কোন বাংলাভাষার মিডিয়াঘর তাদের সাংবাদিকদের ব্রেজিলে পাঠাবে না অলিম্পিক্সকে বাঙলায়ে দেখাতে, ইউসেইন বল্টকে ইন্টার্ভিউ করে নিচে বাঙলায় লেখা অনুবাদ বা ডাব করতে, বা দীপা কর্মকরের পেছনে ঘুরঘুর করাতে। টাকার অভাব বা কমতির বিষয় কি না আমি জানি না, হতেও পারে, কিন্তু আমার মনে হয় তিনটে-চারটে প্লেনের টিকিট, হোটেল আর গাড়ি ভাড়া আর খাবারের খরচ, এসবের পয়সা আছে। মার্কেট না থাকলেও মার্কেট অনেক সামাজিক জিনিশেই দেখবেন, হাওয়া থেকে গড়া যায় (যেমন দেখুন গত কয়েক দশকের ফেয়ার অ্যান্ড লাভ্লি, বা আজকালকার ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম…ওইগুলো নিয়ে আর এখানে বেশি লিখব না আজকে)। জাতিকে যখন এত সহজে তার শারীরিক সৌন্দর্য আর আত্মবিশ্বাসের ওপর মানসিক আঘাত পৌঁছানো যায়, তাহলে তার উল্টোটাও (জাতির সেবা) একই ভাবে সহজ হওয়া উচিত। দরকার আছে, যেমন আমার মুসলমান ভাইরা বলে…নিয়্যতের।

তা ছাড়া সোশাল মিডিয়াতেও বাংলাভাষার ছাপ ছোট। পডক্যাস্টে কত হাজার হাজার লোকের ভ্যাড়রম শোনা যায়। পৃথিবীর সব ভাষাতেই আছে পডক্যাস্ট। ইংরেজিতে তো দেখি, কেউ কিছু ঘন্টাখানেক ধরে সমাজ চর্চা করে, কেউ বেড়ানো নিয়ে কথা বলে, কেউ হাঁসির বা ভুতের গল্প, কেউ বিবাহ-সম্পর্ক নিয়ে পরামর্শ দেয়, কেউ স্টক মার্কেট নিয়ে কথা বলে। আমার স্ত্রী আজকাল তিনজন ফাজিল বেকার ছেলের পডক্যাস্টে পাগল হয়ে গেছে, সাথে আমারও মাথা খাচ্ছে। ছেলেগুলোর মন্তব্য যে অন্য জগতের অস্তিত্বরা নাকি পিরামিড বানিয়েছিল, আমরা ওদের পুতুলখেলা, ইত্যাদি। আমি ভাবলাম, আচ্ছা এরা ক্যাবলা হলেও, এরকম তিনজন বোকার ভ্যাড়রমও যদি বাঙলায় পাই, মন্দ নয়। ও বাবা, বাঙলায় কেবল ১২টি পডক্যাস্ট আছে। আপ্লডার কেবল একজনই, জশুয়া প্রজেক্ট। সব আদম আর ইভের কাহিনী, জিশুকেষ্টর বানী, ইত্যাদি। এতে খারাপ কিছু নেই। ধার্মিক আলোচনাও ইংরেজি ভাষায় প্রচুর আছে পডক্যাস্ট, এবং সমস্ত ধর্মেরই আছে, কিন্তু বাঙলার হচ্ছে এই অবস্থা পডক্যাস্টের জগতে। ইউটিউবে সেদিন দুটো ফাজিল বাঙালি ছেলের মজার একটা ভিডিও ব্লগ পেলাম, কিন্তু ওরাও সেই ইংরেজিতেই বা ইংরেজি-মেশানো বাঙলাতে কথা বলে। https://www.youtube.com/channel/UCYwlGjV9NCYxwVBSqFIzj5w/featured

আমার প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলব যে বেশিরভাগ কলকাতা থেকে আসা বাঙালি আমেরিকার জায়গায় জায়গায় একটি সরস্বতী পূজা ও একটি দুর্গা পূজার অনুষ্ঠান করে। তাছাড়া শনিরবিবারগুলোতে সারাক্ষণ ওই এলাকার প্রবাসী বাঙালি সমাজের মধ্যেই ঘুরঘুর/নেমন্তন্ন ইত্যাদি চলতে থাকে। সেই নেমন্তন্নগুলোতে অবাঙালিরা কেবলমাত্র তারা হয় যারা বাঙালি বিয়ে করেছে। এই জমায়েতগুলোতে একজন অবাঙালি পক্ষ হলেই কিন্তু যেন সমস্ত সংগ্রহের ওপর অস্বস্তি ছড়িয়ে যায়। যারা বাঙালিরা, তারা হাজির হয়েছে সপ্তাহের শেষে তাদের গুষ্টির সাথে গপ্প করতে, চাবিস্কুট খেতে, কলকাতা আসাযাওয়া নিয়ে, কার বিয়ে হচ্ছে, ট্রাম্প কি বলল, ইত্যাদি। তবে জমায়েতের আরেক মূল কারন হচ্ছে বাংলাভাষায় কথা বলার সুযোগ পাওয়া। এইখানে একজন অবাঙালি থাকলে সবাই একধরনের চাপ পায়, ইংরেজিতে কথা বলতে। আবার সে অবাঙালি মানুষও এইটা বোধ করে, যে আমি যেন এই সংখ্যালঘু সরনার্থী শিবিরে আক্রমণ করছি। কিন্তু তারও একটা অধিকার আছে, মাসের পর মাস যদি প্রত্যেক নেমন্তন্ন এই প্রবাসী বাঙালি গুষ্টির সাথেই হবে, তাহলে তারও তো খারাপ লাগবে। আচ্ছা তাকে বাদ দি, কেননা এইটা স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কের বিষয় এবং এই অস্বস্তি শুধু বাঙালি-অবাঙালি বিবাহ এবং তাদের আশেপাশের বন্ধুবান্ধবদের, কিন্তু বাচ্চাদের কি অবস্থা? বাচ্চারা পাচ্ছে না দেখতে বাকি আমেরিকান সমাজের বন্ধুবান্ধবদের। বাবামায়ের যদি সমাজে শুধু বাঙালি বন্ধুই হবে, সেটাও ক্ষতিকর। এই গুষ্টিগুলোতে যোগ দিয়ে যে বাচ্চারা বাঙলা শিখছে, তা নয়। সমস্ত গুরুজনেরা সেই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের মতন বাংলিশ বলতে অভ্যস্ত, যা শুনলে বাচ্চাদের বাঙলা জানবার দরকার থাকেই না, তার সাথে বাকি বাচ্চাগুলোও বাঙলা জানে না। ওই গুষ্টিতে কেবল এক প্রধান বিভাজন থাকে…বড়রা, যারা বাংলিশে হোহোহাহা করছে (আর মাঝে মধ্যে সেই বেচারা অবাঙালি ব্যাক্তির সাথে how are you করছে), আর ছোটরা, যারা তাদের বাবামাদের ঠাট্টা-আনন্দে যোগদান কোনদিন করতে পারবে না। এক বাঙালি পরিবেষের গুরুত্বটা আমি অস্বীকার করব না একজন বাঙালি গড়তে, কিন্তু সে বাঙালি পরিস্থিতিটার স্বভাব আসলে কেমন, সেটার ওপর নজর দেওয়া দরকার। আমার কিছু আমেরিকায়ে জন্মানো-ও-পালিত বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধু আছে, যারা বাঙলায়ে একদম অনর্গল, এমন কি তাদের আঞ্চলিক টান পর্যন্ত আছে। তারা  গ্রীষ্মকালের তিনমাসের ছুটি কাটাতো তাদের বাংলাদেশের গ্রামের বাড়িতে, যেখানে লোকজন ইংরেজি জানেই না, কিংবা জানলেও বাঙলায়ে কথা বলার সময় বাংলিশ মারে না। সেই থেকে এরা বাঙলা শিখেছে, প্রবাসী গুষ্টি থেকে নয়।

সমাপ্তে আমি নিজের প্রকল্পিত পদ্ধতির সংক্ষ্যেপ করব। সংখ্যালঘু অবস্থায় বাঙলা জানা এক শিশুর কাছে অমূল্য আমেরিকায় বড় হতে হলে। এ শেখার জন্যে বাঙালি গুরুজনদের কেবল বাঙলাতেই কথাবাত্তা বলতে হবে বাচ্চাদের সাথে। কোনরকমের ইংরেজি মেশানো চলবে না। আজকাল আর ডিকশানারির দরকার নেই, পকেটে আছে স্মার্টফোন ও গুগল ট্রান্সলেট। কথার সাথে লিখিত বাঙলা শেখানোর আয়োজন করা উচিত। দেশে আমরা ১২টা না কত সাবজেক্টে পড়াশোনা করতাম, এখানে ক্লাস ১২ পর্যন্ত ৬টা করে ক্লাস হয় বছরে। সুতরাং চাপ কিছুই নেই, বাঙলা ক্লাস চালু করা উচিত বাড়িতে। বৃহৎ আমেরিকান বাস্তব সমাজের আড়াল কেটে বসবাস করা অনুচিত। কাজের রেডনেক বন্ধুর বাড়িতে বারবিকিউতে যোগ দিন, কালো বন্ধুর বাড়িতে রবিবার এনেফেল আমেরিকান ফুটবল দেখুন। বাচ্চা যেন না দেখে যে আপনাকে (অতএব তার বাঙালি জাতিকে) বাকি সমাজ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে। বাকি প্রবাসী বাঙালি গুষ্টির সাথে ওঠানামা নিজের আনন্দের জন্যে করলে করুন, কিন্তু এতে আপনার বাচ্চার সামগ্রিকভাবে লাভ না লোকসান হচ্ছে, সেইটি বিবেচনা করা উচিত। সমস্ত প্রবাসী পরিবারের কাছে তাদের বাচ্চাদেরকে ভারত বা বাংলাদেশের কোনও একটা গ্রামের বাড়িতে রাখা বছরে তিন মাসের জন্যে এক অসম্ভব প্রস্তাব। আমার চোদ্দপুরুষের মধ্যে কেউ গ্রামে থাকেনি, সবই ওই কলকাতার আশেপাশের, আর আমি কাউকে চিনি না যৌথ পরিবারে যে কেবল বাঙলা জানে, ইংরেজি জানেই না। সুতরাং আমার বাংলাদেশি-আমেরিকান বন্ধুর মতন পরিবেশ পাওয়া অসম্ভব, কিন্তু না পাওয়া মানে হার মানা, তাও চলবে না।

আশা করি আমার মন্তব্যতে লোকজন আক্রান্তবোধ না করে, যদিও দুঃখবোধ হওয়া স্বাভাবিক।

শেষে একটি গান রেখেদিলাম, বাংলাদেশের সিলেট জেলার কবিয়াল ফকির লাল মিয়াঁর লেখা, সাথে গানের কথা নিচে দিচ্ছি।

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থাকি করো শিল্পের বড়াই
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক তবু ভাই পরের ও বাসা
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”

ছোটোবেলা টনসিলে গাল প্রায় ফুলতো
মা’র কোলে মাথা রেখে সারা রাত কাটতো
ঘুম নাই মা’র চোখে, সারা রাত জাগতো
বাংলায় সুর করে ছড়া-গান গাইতো।

বড় হয়ে সেই মা’কে তুমি-আমি ভুলে যাই
মা’র সেই রাত জাগা রাত আর মনে নাই।
মা’কে দেই কষ্ট, তার কথা শুনি না
মা’র গাওয়া ছড়া-গান আর ভালো লাগে না। হয়তো বা ভুলে গেছি মা’কে দেওয়া কষ্ট
ছোটখাটো কাজ নিয়ে হয়ে গেছি ব্যস্ত।
বড় ভাই ওরা যদি আজ বেঁচে থাকতো
দিন রাত মা’র মুখে হাসি ফুটে থাকতো
মা’র চোখে জল আর বুক ভরা বেদনা
আমাদের না আছে নাম না ঠিকানা
কী ছিলাম কী হয়েছি! লজ্জায় মরে যাই
মা যে কবে হেসেছিলো একটুও মনে নাই।

কার্জন হল থেকে সুর ভেসে আসলো
জিন্নাহ’র কথাগুলা বুকে এসে লাগলো
হারামিটা করেছিলো অবিচার অন্যায়
মা’র মুখ ভিজেছিলো বেদনার কান্নায়

রাজপথ ভেসেছিলো রক্তের বন্যায়
ইতিহাস গড়েছিলো বাহাদুর বাঙালি
আজ সেই বাঙ্গালিকে অপমান করেছি
জব্বার রফিকের মিছিলের মানে কী?

তুমি আমি সব আজ হাটুভাঙ্গা বাঙালি
সব তারা দিয়ে গেলো, আমরা কী করেছি?
নিজের ভাষাকে ভুলে পরেরটা শিখেছি?
হাততালি জুড়ে দাও, সাব্বাশ এই বাঙালি!

নিজের কপালে আজ নিজে লাথি মেরেছি
গায়ের চামড়াটাও নিজ হাতে ছিঁড়েছি
ছি ছি ছি দেখো বাঙ্গালির কাণ্ড
বেহায়া বেশরম দুনিয়ার ভণ্ড।

বাবুই পাখিরও যদি ইচ্ছা করতো
অট্টালিকাতে তারাও থাকতে পারতো
নিজের সেই কাঁচা ঘর ছাড়তে সে রাজি না
কোনো ঝড় তার মত বদলাতে পারেনা

নিজের সেই কুঁড়েঘর ফেলে রেখে যায় না
ছি ছি ছি দেখো বাঙ্গালির কারবার
মরে গিয়ে পাখি হয়ে জন্মানো দরকার
মাইকেল মধুর এই বঙ্গ ভাণ্ডার।

আমাদের ফাঁদে পড়ে একবারে ছারখার
বাংলার কবি রা কলম হাতে বসতো
বিশ্বটা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতো
নজরুল-ঠাকুরের বাহাদুরি চলতো

প্রতিবেশী দেশগুলা মাথা নত করতো
একদিন ওরা ছিলো বাংলার ভক্ত
কালকে যে কী ছিলাম আজকে কী হয়েছি
ডোরাকাটা বাঘ থেকে নাক কাটা বাঙালি!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s