অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১

শনিবার দিন দুপুর বেলা হচ্ছে সপ্তাহের সবচেয়ে কার্যরত সময় একটি, কিছু ধরনের মজা করার। আমাদের এই ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায়ে সাধারণত অনেক কিছু দেখার বা করার মতন থাকে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিউজিয়ামগুষ্টি এখানে আছে, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম। তা ছাড়া অনেক সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আছে আশেপাশে, জঙ্গল, পাহাড়, ঝরনা, পুরনো দুর্গ, ইত্যাদি। আর নাটক, নানা ধরনের সঙ্গীত উৎসব, সিনেমা উৎসব, খাদ্য উৎসব, কোথাও না কোথাও চলতেই থাকে। তবে শনিবার দিনগুলো যখন স্যাঁতস্যাঁতে মেঘলা আকাশে ঢাকা থাকে, তখন আর কি করব? বাড়ি বসে খিচুড়ি খাওয়া আর নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবে সিনেমা দেখা ছাড়া আর উপায় নেই।

এবারের মেঘেঢাকা শনিবার দুপুরকে আমি পরাজিত করলাম। বাড়িতে ডাকা হল দুজন বন্ধুদেরকে। বের হল আমার সবচেয়ে প্রিয় বোর্ড গেম,  অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১। প্রথমবার বা নতুন খেলোয়াড়দের সাথে খেলতে গেলে খেলাটা লেগে যায় বেশ ৭-৮ ঘন্টাখানেক। এ খেলায় দরকার দাবার চেয়েও বেশী কৌশল, আর পাশার চেয়েও বেশী চট করে মনের মধ্যে সম্ভাবনার অঙ্ক কষা, আর খানিকটা অবশ্যই ভাগ্যের সহযোগিতা। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের খেলতে সময় লাগে মাত্র আড়াই ঘন্টা, আর সে বিলাসিতা আমাদের সকলের মধ্যে এবার ছিল। সাথে সাথে বাচ্চাকে খাওয়ানো ঘুমপাড়ানোতে পুরো খেলা খেলতে লাগল ৪ ঘন্টা এবার। মন্দ নয়। আর বেশ জমেছিল। প্রত্যেকটা ছক্কার চালের আগে সবার মধ্যে যেন একটা বুকের মধ্যে হাঙ্গামা হচ্ছিল, আর চালের পর জোর আওয়াজে দীর্ঘশ্বাস, একদলের বেদনা, অন্যদের আনন্দ, ঠাট্টা।

খেলাটির প্রসঙ্গ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে। ২টো দলের খেলা, অ্যাক্সিস এবং অ্যালাইজ। অ্যাক্সিসে আছে জার্মানি ও জাপান, অ্যালাইজে আছে রাশিয়া, বিলেত ও অ্যামেরিকা। ৫জন খেলোয়াড় থাকলে একজন একেকটা দেশ নিয়ে খেলতে পারে, বা ২জন থাকলে একজন গোটা অ্যাক্সিস আর অন্য ব্যাক্তি গোটা অ্যালাইজ হয়ে খেলতে পারে। ৩ বা ৪ থাকলে নিজেদের অনুযায়ী নিজেদেরকে ওই দুটি দলে বিভক্ত করে নিতে পারে।

Axis & Allies 1941 is Setup and Ready to Play

এ খেলায়ে বহুত নিয়ম আছে। মূল নিয়ম হচ্ছে একজন দেশের পালার সময় প্রথমে তাকে তার পয়শা দিয়ে নানান ধরনের সামরিক বিনিয়োগ করতে হবে, যেমন ট্যাঙ্ক না ফাইটারপ্লেন না জাহাজ কিনব। দ্বিতীয় হচ্ছে যুদ্ধ করা, যেটা ছক্কাগুলো দিয়ে হয়। তৃতীয় হচ্ছে যুদ্ধহীন চাল খেলা, যেমন কোন নিজের দখলের জায়গাতে নতুন সৈন্য এনে সেখানটাকে আরও মজবুত করা। আর অন্তম হচ্ছে প্রথম পর্যায়ে নতুন কেনা ঘুঁটিগুল নিজের যেখানযেখানে কারখানা আছে, সেখানে বসানো। খুঁটিনাটি নিয়মগুলো হচ্ছে জানা যে কোন চালগুলোকে যুদ্ধের চাল হিসেবে ধরা হয়, কোনগুলো ধরা হয় না, জানা যে একটা ঘুঁটি একবার যুদ্ধ করে থাকলে সে ঘুঁটি ওই পালায়ে আবার যুদ্ধ করতে পারবে না (এরও আবার ব্যাতিক্রম আছে), ইত্যাদি। এ কারনে প্রথম দুএকবার খেলবার পর যখন সমস্ত খেলোয়াড়েরা নিয়মগুলোতে পাকা হয়ে যায়, তখন সত্যিকারের খেলাটা জমে ওঠে। ওই প্রথম দুএকবার অনেক সময় কেটে যায় তর্কবিতর্কে, নিয়মের বইটা ঘেঁটে দেখা, ইন্টারনেটে ফোরাম পড়া।

আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ খেলার জন্যে হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইদানীং রাশিয়া। আমার মতে সবচেয়ে কঠিন এদের প্রারম্ভিক অবস্থান। সবচেয়ে কম টাকা, এবং জার্মানি একদম ঘাড়ের ওপরে। রাশিয়া হয়ে যেই খেলবে, তার উচিত যাহোক করে টিকে থাকা। একটা ট্যাঙ্ক আর একটা সৈন্যর চেয়ে ৩জন সৈন্য প্রতিরক্ষার জন্যে আমার মতে বেশী কার্যকর (দুয়েরই একই দাম পড়ে)। তারপর সবচেয়ে প্রিয় দেশ খেলার জন্যে হচ্ছে জাপান। এদের হয়ে খেলা সোভিয়েতের মত কঠিন না হলেও শক্ত আছে। নানান দিকে নিজেদের রাজত্বকে সম্প্রসারিত করতে হবে যদি চট করে অ্যামেরিকার আর্থিক ক্ষমতাকে দমন করতে হয়। তা না করলে অ্যামেরিকা শেষের দিকে খুব সহজে জাপানকে পরাভূত করে দেবে। তার সাথে জাপানের সাথে ছিল আমাদের নেতাজী, তাই জাপান হয়ে খেললে ভারত থেকে ইংরেজদের পরাজিত করতে পারলে আমি বাস্তবে একটু সুখ পাই, যে আজাদ হিন্দ ফওজ এ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল। খেলার সাথে সাথে খেলার একটা গল্প রচিত হয়ে যায় প্রত্যেকবার। জাপানের পর বলব সবচেয়ে ভালো লাগে অ্যামেরিকা হয়ে খেললে। এদের বলা যায় সবচেয়ে সহজ অবস্থান, এবং দুএকটা কৌশলগত ভুলও করা যায় অ্যামেরিকা হয়ে, কেননা টাকার অভাব নেই, আর সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেশ দূরে সরানো। জার্মানি ও বিলেত দুটোই কঠিন আর খেলতে গিয়ে আমার ব্যাক্তিগতভাবে সবচেয়ে কম মজা পাই। তাও কেবল দুজন খেলোয়াড় হলে সমস্ত দুটি বা তিনটি দেশ হয়েই খেলতে হয়।

গত শনিবার আমার বউ আর তার এক বান্ধবী আমাকে আর আমার বন্ধুকে খুব সংকীর্ণভাবে হারালো। আমরা ছিলাম অ্যালাইজ। আমার বন্ধুর হাথের চাল এতই খারাপ, ওর কিছু কিছু যুদ্ধে ও ৩-৪টে ট্যাঙ্ক হারাতো দুজন সৈন্যর বিরুদ্ধে (একেকজন সৈন্য মারে ১ পড়লে, আর একেকটা ট্যাঙ্ক মারে ৩, ২ ও ১ পড়লে)। যাতা একদম। খেলার পরে বেশ কিছুদিন ধরে টেক্সট মেসেজে আমাদের বিশ্লেষণ চলেছে। রিম্যাচ তো হবেই হবে। তাও সত্যি বলতে গেলে এ পরাজয়ে একটু আনন্দ পাচ্ছি আজকাল। বউও এখন ভালো করে খেলাটা শিখে গেছে, আর মাঝে মধ্যেই ঠাট্টা করে আমাদের হারা নিয়ে। মজা কর এখন। হাম কাল তুমকো দেখলেঙ্গা 😀

পুনশ্চ: এ খেলার কয়েকটি সম্পাদনা আছে। আদি খেলাটি ১৯৮০ দশকে বেরিয়েছিল, যেইটি সত্যিকারের দিন-দুএক লাগে খেলতে। আর ওই খেলার নিয়মগুল আরও বেশী জটিল। এই “অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১”টা একটি নতুন সংস্করণ, গত ৫ বছরে বেরিয়েছে, একটি সহজ ও পরিচায়ক খেলা হিসেবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s