আর আমারে মারিস নে

যে পরিমাণে মানুষ কচুকাটা হচ্ছে আজকাল, মানুষ জীবনের মূল্য একেবারে ডুব দিয়েছে মনে হয়। মাঝে মধ্যে ভাবি এর মূল কারণ বোধয় মানুষের জনসংখ্যা সত্যিই বেশী অতিরিক্ত হয়ে গেছে। এই ভেদাবেদের বৈষম্য চিরকাল ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় মানুষের সংখ্যা যত আকাশ ছোঁয়ান পর্যায়ে পৌঁছুবে, তত বেশী এই হিংসাত্বক কান্ডকারখানাও বাড়বে। কেননা এখন ২০০ লোক মরা মানে আগেকার দিনে ৫জন মারার সমান। এর মধ্যেও এক শ্রেণী হিসেবে অসাম্য বিশেষ করে সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়ছে। এ অসাম্যের পেছনে ব্যাক্তিগত স্বার্থের ব্যাপার আছে, আর আবার আছে আমাদের বাস্তব সংবাদ জগত এবং তাদের কোনদিকে হেলান পড়ে। আমি অস্বীকার করব না এ কথাটি। বাংলাদেশে পুরোহিত হত্যা বা শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো আমাকে মনের এমন এক জায়গায় আঘাত করে একজন বাঙালি এবং হিন্দু হয়ে যেটাতে ইরাকের সুইসাইড বম্বিঙ্গে ২০০জন আহত হলে আমার কাছে সেইটা কম পর্যায়ে আঘাত আনে (“আরশোলার মতন পিলপিল করে জন্মা আর ওরকম করে মর”)। একই ভাবে যখন ১৯ বছর বয়সের তরুণ ভারতীয় উৎসের আমার মতন আন্তর্জাতিক নাগরিক খুন হয়, সেটার দাম সৌদির মারামারিতে মানুষ মরার চেয়ে মূল্য বেশী। আমি ফেসবুকে অনেককেরই দেখি তাদের মতগুলি, যে প্যারিসে ২০জন মারা গেল আর বেইরুটে ২০০, কিন্তু “প্রে ফর প্যারিস”এর হুজুকেই কেন লোক মেতে ওঠে, আর বেইরুটের মানুষ কি মানুষ নয়? আমার মনে হয় মানুষ সবাই, কিন্তু এ কথাটি এক দূরের আদর্শ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আজকাল। আর যত এসব খুনখারাবি চলতে থাকবে, তত বেশী আমরা আমাদের আদিম ভাবধারার ছিদ্রে পড়ব, কোন উপায় নেই।

নিশ্চিত করনীয় কিছু নেই। নিজে চেষ্টা করব যেচেয়ে ভিড়ওলা জায়গায় না যেতে। সুক্কুরবার রাতে যদি সিনেমা হলে সিনেমা দেখা আর বাড়িতে বসে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখার সামনে দুটি বিকল্প থাকে, তখন বাড়ি থেকে বেরুনোর বিপক্ষের যুক্তিদের মধ্যে (বাড়ি থেকে বেরুনো, সিনেমার টিকিটের দাম, বাড়ির আরাম ত্যাগ করা) এটাও পেছনে পেছনে বা সামনাসামনিই থাকবে, যে কোন দিশেহারা পাগল যদি আটোম্যাটিক বন্দুক নিয়ে মানুষকে খুন করতে বেরোয়ে সেই সিনেমা হলে, তাহলে তার থেকে আমরা বাড়িতে থাকলে বাঁচব। এমনিতে আমি এসব বিশাল মেন্সট্রিম পপ জগতের কালাকারদের ভক্ত নই। ২০০ ডলার দিয়ে দূর থেকে বিয়ন্সেকে দেখা বা সুপার্বোল দেখার চেয়ে আমি ওই ২০০ ডলারটি দেশের গরীব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে বেশী আনন্দ এমনিতেই পাই, আর বোমাবাজির জগতে এসব মানবগুষ্টির মহামিলনকেন্দ্রে গেলে প্রাণ যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আরেকটা কথাও আজকাল মনের মধ্যে ঘুরপাক করছে, দুএকটা কোরানের আয়াত মুখস্ত করলে ক্ষতি নেই, বিশেষ করে সেই মুহূর্তে জীবন ও মরণ যদি এর জানার ওপর নির্ভর করে।

আশা রাখলাম জীবনটা নির্ভয় কাটানোর মতন আত্মবিশ্বাস কোনদিন যেন না হারাই। আর এত আঘাত খেতে খেতে অমুসলমানদের মধ্যে (বিশেষ করে ভারতীয়) ইস্লাম-বিদ্বেষীকতা বাড়বেই। আদর্শ হিসেবে আমি বরাবরই রাখব যে এ ঘৃণাত্মক মনোভাব কখনও ব্যাক্তিগত আচরণের ওপর প্রভাব না ছড়ায়ে।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s