সহজ গান

কয়েক বছর আগে আমি একজন ব্যক্তির কাজের সাথে পরিচিত হই youtube জগতে। সৌমিক দে নামের ভদ্রলোক। তিনি মাঝে মধ্যে পশ্চিম বাঙলার নানা গ্রামগঞ্জে বাউল সঙ্ঘগুলির ভালো  উচ্চশ্রেণীর ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড করেন। এই রেকর্ডিংগুলিতে তিনি একেবারে ওইখানে বসে গান শোনার ভাবটি আনতে পারেন, যা আমি আমার এত বছরের youtube চর্চায় আর কারুকে এত ভাল করে করতে পাইনি আজ অবদি। সৌমিকের কারনে আমি “মনের মানুষ” সিনেমা বেরুনোর বছর দুএক আগের থেকে গরভাঙ্গা গ্রামের বাউলগুষ্টির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। আমি যখন সিনেমাটি দেখি তখন আশ্চর্যে ভাবি, এদের তো দেখেছি অনেক বেশী ব্যক্তিগতভাবে। তখন আমি দূর্গা পুজোর কিছুদিন বাদে অ্যামেরিকা থেকে ১ মাসের ছুটি নিয়ে গেছিলাম। ৪ দিন বহু কাকুতিমিনতি করে পরিবারের কাছ থেকে রওনা দিয়ে গিয়ে থেকেছিলাম ওই গরভাঙ্গা গ্রামের আশ্রমে। তখন কোন ফাঙ্কশান-টাঙ্কশান ছিল না। যেমন বাউলের ঘরের গান সৌমিক ইন্টারনেট জগতে উঠিয়ে দেয়, ঠিক সেই অভিজ্ঞতা আমার সামনাসামনি হয়েছিল।

সেখান থেকে আসার পর থেকে খুব জায়গাটাকে মনে করি, যেন সেইদিনই ছিলাম সেখানে। আসার পর থেকে সেই youtube থেকেই যা পাচ্ছি। সৌমিক আজকাল নিজেও ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে দারুণ সঙ্গত দিচ্ছে বাউল শিল্পীদের ওনার আজকালকার রেকর্ডিংগুলোতে।

কিছুদিন আগে একটা নতুন পোস্ট হয়েছে, হাফিজ মাসুম নামের একজন বাউল শিল্পী পাশের বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন মুর্শিদাবাদে। আমেরিকার চলিত ভাষায় লোকটার একটি গুণ আছে, যাকে বলা হয় swag বা swagger। swag জিনিশটা মানুষের নিজের থেকেই থাকে, এইটা চেষ্টা করে আনানো যায় না। মূলতভাবে বলতে গেলে ব্যক্তির অন্তর থেকে এক আকর্ষণিয় প্রতিভা অনুভব করতে পারলে তাকে বলা যায় তার swag আছে। কথাটি এমনিতে র‍্যাপ সঙ্গীতের জগতে অনেক ব্যবহার করা হয়, আর মাঝে মধ্যে পুরনো আফ্রিকান-আমেরিকান সঙ্গীতেও দেখেছি ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এ গুণের বেশী প্রচলন অন্তত স্পষ্টভাবে নেই বলে যখন আমি খুঁজে পাই, তখন বেশ মজার লাগে। শিল্পীকে দেখা যায় কিরকম অপুর্ব তালজ্ঞান আছে, তার সাথে গানের মাঝে থেমে থেমে তত্বজ্ঞান ছাড়ছেন। আর বেশ আনন্দে মেতে আছেন, হেঁসে হেঁসে গাইছেন। আর আরেকটা জিনিশ যেটা আমার ভালো লাগল এনার গানে হচ্ছে যে ইনি নিজের গলার আওয়াজ কতটা সুরে থাকতে পারল, তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। যথাযথভাবে যখন নিজের গাইবার দরকার পড়ে না, তখন নিজে থেমে ব্যাকগ্রাউন্ড গায়কদের দিয়ে তিনি লাইনটা শেষ করিয়ে নেন, আর নিজে জিরিয়ে নেন পরের তত্ব দান করার জন্যে।

গানটা মন দিয়ে শুনলে  কিরকম লোকটি আপনার ভাবকে উঁচিয়ে দিতে পারে, আর মাশেকপুর কোথায় বা সেখানকার বাবাজান কেমন লোক, তা জানার দরকার পড়ে না। অন্তত আমার হৃদয়ের মধ্যে একটা ধড়প ধড়প মতন মনে হয় গানগুলো যখন শেষ হওয়ার দিকে এগোয়ে। যেন মনকে এক মাত্রা থেকে আরেক মাত্রা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেল ওই ৪-৫ মিনিটে।

আরেকটিও বেরিয়েছে হাফিজ মাসুমের, যদিও এইটা কেবল অডিওই। এতেও অনেক থেমে থেমে গান গাওয়া আছে, আর ওপরের ভিডিও দেখলে কল্পনা করাই যায় কেমন উত্তেজনা বা তাপের সাথে শিল্পী এই তত্বগুলি দিচ্ছেন একটার পর একটা।

এইরকম সঙ্গীত পরিবেষণের প্রতি আমার ব্যক্তিগত আকর্ষণ বোধহয় জমিয়েকার রেগে সঙ্গীত থেকে আসে। রেগে সঙ্গীতে আবার বোধহয় ভারতীয় উপমহাদেশের পুর্ব প্রান্তের ছাপ থাকতেও পারে। রেগে সঙ্গীতের প্রধান আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা হচ্ছে রাস্তাফারাই নামের এক সম্প্রদায় যাতে ভারতের ১৮০০ শতাব্দীর অভিবাসীরা যারা ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে গেছিল, তারা সেখানকার ধর্ম ও সংস্কৃতি ছুঁয়ে গেছিল। রাস্তাফারাইরা সাধুফকীরদের মতন জট রাখেন, গাঁজাকে পবিত্রভাবে মানেন, অনেকে আবার মাছ মাংস ত্যাগ করে। আরও কিছু আমি রাস্তাফারিয়ান রেগে গানের মধ্যে শুনেছি কিছু সনাতনী তত্ব যেমন পয়শা ধার নিলে মানুষের আত্মা ছটফট করে। একটা নতুন ডকুমেন্টারি বেরিয়েছে “ড্রেডলক স্টোরি”, এখনও দেখিনি কিন্তু এইগুলো নিয়ে অনেক চর্চা কেউ কেউ করেছে:

http://indiaempire.com/article/614/practices_of_indian_sadhus_are_seen_in_the_rasta_way_of_life

এইরকমের রেগে সঙ্গীতে আমি অভ্যস্ত ক্যারিবিয়ানের এত কাছে থেকে। এদের পোশাক থেকে ভাব এবং মনের দরদ অনেকটা বাউলের সাথে মিল আছে যদিও ওপর থেকে দেখলে বোঝা যায় না।

Advertisements