মায়ের থাপ্পড়

আত্মনিবিষ্টতার চরম পর্যায় পৌঁছুলে এরকম ভাবনা মনে ঘুরঘুর করতে থাকে। প্রোগ্রাম ছিল এই উইকেন্ডে মায়ামি যাবার, অনেক স্কুলের বন্ধুদের সাথে পুরনো বন্ধনগুলি আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনবার। পুরনো বন্ধুদের সাথে মিলনের এক অন্য সুখ। বিশেষ করে জীবনের এই পর্যায়ে দেখতে পেলে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে, অনেক হাঁসি ঠাট্টা করা যায়, ইত্যাদি। সবই ভালো, তবে যখন টিকিট কিনেছিলাম, তখন খেয়াল হয়নি যে যে উইকেন্ডে যাবার আয়োজন করছি, সেইটি এবারের দুর্গা পূজার সপ্তমী অষ্টমী।

বিদেশে দুর্গা পূজোটা আজ অবদি ঠিক কিভাবে দেখা উচিত, সেটা এখনও নিজের মধ্যে সমাধান করে উঠতে পারিনি, আর বাকি পরিবারও তা করেনি। মানে দেশের মধ্যে থাকাকালীনও আমাদের পরিবার যে সারাক্ষণ কলকাতায় থাকত, তা নয়। আমার দাদু নিজে কটকে বড় হয়েছে। তখনকার দিনের প্রবাসী পরিবারদের টেম্পলেট ছিল ভারতের বা যেকোনো জায়গাতে থাকো না কেন, ওই বিয়েবাড়ি, পূজা, পইতে, এইরকম ফাঙ্কসানে লোক নিজের শিকড়ে ফেরত যেত, যা আমাদের ক্ষেত্রে ছিল উত্তরপাড়া। সেখান থেকে তারপর আমার মায়ের জেনরেশনে আমরা আমেরিকায়ে এসেছি। এখন আমেরিকার মধ্যে আবার আমি বড় হয়ে মাদের বাড়ির থেকে অন্যান্য জায়গায় চাকড়ি পড়াশুনা ইত্যাদির জন্যে থাকি। তা এখন শিকড়ে গিয়ে পূজা কাটানো মানে কি যেখানে মায়েরা আমেরিকায় থাকে, সেখানে যাওয়া? নাকি প্রত্যেক বছর নিজের উদ্যোগে এই এক-দু সপ্তাহ ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসল পূজোয়ে যাওয়া? মানে পরিবারের সাথে পূজা কাটানোর সাথে সাথে সে তখনকার প্রবাসে থাকা বাঙালির কাছে শিকড়ে ফেরত যাবার কিন্তু অনেক বেশী আকর্ষণ ছিল। সে পূজোয়ে ঢাকি থাকত, কেবল টেপ বাজত না। সে পূজোয়ে সমস্ত শ্রেণী নিয়ে গোটা সমাজ থাকত, যাতে আমার মনে হয় এতেও এক অজানা সুখ আছে, কেবলমাত্র বিশাল গয়নাগাটি পড়া দামি সাড়ি পাঞ্জাবি পড়া আর ফায়ার অ্যালার্মের জন্যে ধুনুচি না করা, মানে এই দুর্গা পূজা আর সেই দূর্গা পূজার অনেক বাস্তব এবং আধ্যাত্মিক তফাৎ আছে। তাছাড়া এখানে নভেম্বর মাসে কিন্তু বেশ এক টানা প্রায় ১ সপ্তাহর ছুটি পাওয়া যায় থ্যাঙ্কসগিভিঙ্গের, যখন থেকে অফিসে সবার বেশ ক্রিসমাসের মোচ্ছব লেগে যায়। সেই সময়টা থাকতে কি আর পূজার সময় ছুটি নেওয়াটা মানায়? আর নিলেও সে আমেরিকার মধ্যেই আরেকটা ঘুমন্ত পূজোয়ে গিয়ে হাজির হতে? কে জানি।

 

161006125155-live-stream-hurricane-matthew-bahamas-large-169

তাও বোধয় এত কিছুর মধ্যে হয়ত সেই দূর্গা পূজার উইকেন্ডেই অন্য জায়গায় যাওয়াটাও ভুল। তাই মনে হচ্ছে এই ঘুর্নিঝড় যেটা আমাদের সমস্ত প্রোগ্রামকে উড়িয়ে দিল, এইটা মায়ের থাপ্পড়। তাই এখন আর যখন কোথাউই যাচ্ছি না, নাই বা কলকাতায়, না বা মাদের পূজায়, নাই বা বন্ধুদের সাথে মায়ামিতে দেখা, ভাবছি কি করা যায় আগামী আর পরশু। কাজের চাপ এমনিতে অতুলনীয়। খানিকটা মনে রেহাই পেয়েছি এই উইকেন্ডটা ফাঁকা হয়ে গিয়ে, কেননা কাজে তাহলে এগুতে পারব। তবে এখানকার লোকাল পূজায়ে কিছু করা তো উচিত, মা যখন থাপ্পড় মেরেইছে। আবার এখানকার লোকাল পূজা নিয়েও একই আশঙ্কাবোধ করি কিন্তু। সেই একগাদা পয়শা ঢালব সারাদিন মুখ চুন করে বসে থাকার জন্যে। নাই বা কারুকে চিনব, নাই বা তেমন ইচ্ছে আছে চেনার। আগে এই ওয়াশিংটন ডিসিতে একা গিয়ে মুখ চুন করে বসেছি গত ২ বছর। এবার বউ বাচ্চা নিয়ে যাব মুখ চুন করতে আর সারাক্ষণ নিজের ফোন দেখতে? কমিউনিটি আয়োজিত পূজাগুলো ছাড়া আবার এখানে একটা কালীবাড়ি আছে, যেখানে বিনাপয়শায় পূজা দেখা যায়। মন্দিরটা আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এমনি সপ্তাহের মাঝে অবসর সময় পেলে ফাঁকা মন্দিরে গেছি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাথেও কিছু ধরনের সম্পর্ক আছে এদের। পূজাটি এখানে আমেরিকার তুলনায়ে সবচেয়ে ভালো করে। এমনিতে দুর্গা পূজার মন্ত্রপাঠে আমি কোনদিন মুগ্ধ হতাম না কলকাতার পূজাগুলোতেও। আমার আসল টান ছিল আরতির ঢাক আর ধুনুচির প্রতি। তবে এই কালীবাড়ির পুরুতের দূর্গা পূজার মন্ত্রপাঠ এক শোনবার জিনিশ। তাঁর ভক্তি শ্রদ্ধা এক অন্য স্তরের, মানে বোঝা যায় যে উনি কেবল গড়গড় করে পাঠ করার জন্যেই করছেন না। প্রত্যেকটি অক্ষর তিনি নিজে জানেন, এবং অন্তর থেকে সেগুলির মানে বুঝে তিনি গেয়ে গেয়ে সে মন্ত্র শ্লোক পড়েন। কিন্তু তাও সেরকম মন বসে না। দুর্গা প্রতিমার সাইজ সে বাড়ির সরস্বতী লক্ষ্মী পূজার সাইজের। গত বছর পড়ছিলাম কলকাতায় বিশাল উঁচু দুর্গা হয়েছে। কি তফাৎ। সোজা কথা বলি, আমার কাছে মায়ের চোখ থেকে এক অসাধারণ দর্শন শক্তি অনুভব করি, যেগুলো বিশাল এক ঘরের পেছন থেকে চোখ সরু করে দেখতে হলে তাহলে সে শক্তি অনুভব করা কঠিন। আমার ব্লগ পড়ে লোকজনের বিরক্তিকর লাগবে, মানে spoiled মনে হবে। সে যাই হই, এইগুলি আমার মনের কথা, আমার দরকার আর পছন্দ প্রকাশ করছি। আর কেবল এদিকওদিকের নিন্দে করছি না। হাথের মুঠোয়ে করনীয় জিনিশ থাকলে আমি তা করতে চাই। মানে আমার পছন্দের স্তরে পূজা দেখতে চাইলে তাহলে আমার এই ভক্তিপূর্ণ পুরুতের সাথে সাথে চাই খোলা প্যান্ডেলে পূজা, যেখানে বড় প্রতিমা বসানো যায়, যেখানে ফায়ার অ্যালার্মের কোন ব্যাপার থাকবে না আর ধুনুচির আয়োজন করা যাবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে হচ্ছে দেশ থেকে ঢাকিদের পুরদস্তুর এক দল যদি আসতে পারে, তাহলে তো ফার্স্ট ক্লাস। এই মন্দিরে ঢাক আছে একটা, কিন্তু ঠিক করে এরকম যন্ত্র কি আর আমাদের মতন ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার সফটওয়্যার ডিভেলপার ইত্যাদি পারি? তালজ্ঞান থাকলে ওই একটা বেসিক ড্যা-ড্যাঙ ড্যাঙ তাও হয়ে যায়, কিন্তু সে ভালো করে ঢাক কি বাজবে? এখানকার কমিউনিটি আয়োজিত পূজাগুলিতে মোটমাট কথা প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০-৪০ ডলার করে নেয় পাঁঠার মাংস খাওয়াতে আর কলকাতা থেকে কোন বড় শিল্পী এলে তো ৮০-৯০ ডলার নেয়। আমারই দুর্ভাগ্য, যে ৮০-৯০ ডলার যদি আমি খরচই করব, তাহলে আমি বাব্লু মাজির ঢাক শুনব, চন্দ্রবিন্দু নয়। আবার কালীবাড়িটা এখানে নিরামিশ কোন কারনে, ঠিক জানি না কেন। হয়ত বিনাপয়শায় ওদের পূজা হয় বলে।

চন্দ্রবিন্দুর জায়গায় বাব্লু মাজি? দাদা আপনি কমিউনিস্ট নাকি? না গো, আমি দুর্গা পূজাটা চাই এক দুর্গা পূজা হতে, আপনার ফালতু রক ব্যান্ড ফিউশন শোনবার জায়গা নয়। সেই, আমার কাছে উপায় খুবই কম। একদম খাঁটি পূজা আয়োজন করতে হলে তাহলে আমাকে বিশাল বড়লোক হতে হবে, যে বছরে একাই ৫০,০০০ ডলার খরচ করে আমি নিজেই সমস্ত কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা বানিয়ে আনব, নিজেই  সমস্ত ঢাকিদের আনব, নিজেই খোলা জায়গা জোগাড় করব, এইসব। সেরকম পয়শা খরচ না করতে পারলে তাহলে অন্য বিকল্প হচ্ছে অন্তত ওই সময়টাতে নিজে কলকাতায় যাবার ছুটি বের করে নিতে হবে।

তাও মনে হয় দুর্গা পূজা পছন্দের মতন না পেলে একদম পূজাকে বয়কট মারলে মা থাপ্পড়ের আয়োজন করে দেয়। তো দেখি কি করি। মুখ চুন করে আরেকটা পূজা কাটাতে হবে মনে হচ্ছে।

Advertisements