ভাবের ব্যাপার

কবিতার কথা জানার আগে গান শুনি, তারপর দুএকটা লাইন ইন্টার্নেটে দি, সেখান থেকে কবিতার কথা বের করি, তারপর আরও মত্ত হই সুরে। এটি এক ভাবের ব্যাপার।

কি অপূর্ব দৃষ্টি। খোলা আকাশ, খালি সুদ্ধ গলা, কেবল একটা একতারা আর খরতাল আর আরধেক তবলা। দর্শকের গুন্ডামার্কা মুখ দেখে নিজের সাথে মিল লাগল। আসলে এই পর্যায়ে সঙ্গীত অনুভব করলে মুখভঙ্গি অমনিই হয়ে যায় আর কি। এটি একটি ভাবের ব্যাপার।

গানের কথা খুঁজতে অন্য গানের মতন অসুবিধে হয়নি, কারণ এইটি লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গোষ্ঠ গান, এখানে দিলাম

বলাই দাদার দয়া নাই প্রাণে

গোষ্ঠে আর যাবনা মাগো

দাদা বলাইয়ের সনে ॥

 

বড় বড় রাখাল যারা

ওমা, বসে বসে থাকে তারা

আমায় করে জ্যান্তে মরা

বলে ধেণু ফিরা’ নে ॥

 

ক্ষুধাতে প্রাণ আকুল হয় মা

ধেণু রাখার বল থাকে না ॥

বলাই দাদা বোল বোঝে না

কথা কয় হেনে ॥

 

বনে যেয়ে রাখাল সবাই

বলে এস খেলি কানাই

হারিলেই স্কন্ধে বলাই

চড়ে তখনে ॥

 

তোরা যা সব রাখালগণে

আমিতো যাবো না বনে

খেলব খেলা আপন মনে

ফকির লালন তাই ভণে ॥

 

আরেক গান, যেখানে সেই ভাবটার দর্শন পেলাম।

এ ধন যৌবন চিরদিনের নয় ।
অতি বিনয় করে নিমাই মায়েরে কয় ।।

কেউ রাজা কেউ বাদশাগিরি
ছেড়ে নেয় অধীন ফকিরি
আমি নিমাই, কি ছাড় নিমাই
ধন ছেড়ে বেহাল লয়েছি গায় ।।

যখন হাওয়া বন্ধ হবে
এই দেহ শ্মশানে যাবে
তখন কুঠাবালাঘর, কোথা রবে কার
ভবের লোভ-লালসে দুকূল হারায় ।।

যাও শচীমাতা গৃহে
আমারে বিসর্জন দিয়ে
এই বলে নিমাই, ধরে মার পায়
ফকির লালন বলে ধন্য ধন্য নিমাই ।।

বাহুবলী ২

কি ব্যাপক সিনেমা বানিয়েছে বাপরে। প্রাচীনকালের ভিত্তিতে গড়া সিনেমা এরকম শুধু হলিয়ুডেরই দেখেছি আজ পর্যন্ত। রাসেল ক্রোয়ের গ্ল্যাডিয়েটর সিনেমা মনে পড়ে, আর তারপর বলব গত দশকে ট্রয়, ৩০০ আর অ্যালেক্সান্ডার এইরকম পর্যায় হয়েছে। ভারত থেকে কেবল বলিউডেই দমবন্ধ হতে হয়েছে ওদের ফালতু শারুখ খানের আশোকা সিনেমার মতন ভন্ডামি দেখতে। হ্রিত্বিকের মুঘলে আজম সিনেমাও সেই বোকা বোকা লাগে দেখতে এই ট্রয় গ্ল্যাডিয়েটরের সামনে। তবে বাহুবলী দেখে প্রথমবার গর্বের সাথে বলতে পারি এই দেখ ভারতের প্রাচীন সভ্যতাকে ভিত্তি করে কি সুন্দর চলচ্চিত্র তৈরি করা যায়। বাহুবলী ১ আমি দেখেছিলাম সিনেমা হলে যখন বেরিয়েছিল। ওই সিনেমাটার শেষের অংশটি ভালো বলা যায়, বিশেষ করে কালাকেয়া মহাজাতির সঙ্গে যুদ্ধের পর্বটি। প্রথম পর্বটি গ্রাফিক্স ভালো হলেও খুবই আস্তে আস্তে চলছিল। আর মেয়েকে পটকানোর ব্যাপারে সেই দিল সের মতন গল্পের লাইন, ধীরে ধীরে জোর করে মেয়েকে যাহোক করে পটকানো, এর পেছনে এক ঘন্টা কাটানোর জন্যে আমি এই প্রথম বাহুবলীর বিশেষ ভক্ত নই। তবে এই দ্বিতীয় ভাগে গল্প ওই বলিয়ুড/টলিয়ুডের স্টিরিওটিপিকালভাবে এগোয়েনি। স্পষ্ট এবং অস্পষ্টভাবে সনাতন ধর্মের উপমা ব্যবহার করে গল্পটি সিনেমা থেকে যেন দর্শনে পরিণত হয়ে গেল। রাত্রিবেলায় ফাঁকা থিয়েটারে একলা আমি (স্ত্রী আমার আগের শোটা দেখতে গেছিল, এই হল কচি বাচ্চা হওয়ার পরিণাম) বসে এমন অনুপ্রাণিত হলাম, যে সিনেমার শেষে স্ক্রিনের দিকে হাত জোড় করে নমঃ করতে উচিত বোধ করলাম। বাড়ি ফেরার পথে মাঝরাত্রে গাড়ির কাঁচ খানিকটা নামিয়ে ডিসি বেল্টওএর হাওয়া খেতে খেতে আমি মে মাসে দুর্গা পূজার এই সাংঘাতিক ঢাক বাজনা শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরলাম।

এই উপরের সম্মোহিত ঢাক বাজনা ইউটিউবে খুঁজে পাওয়াকেও এক মহাভাগ্যবানভাবে মনে করি, কেননা বেশীরভাগ ঢাক বাজনা এরকম পাওয়া মুস্কিল। যারা ইউটিউবের চর্চা করেন, তাঁরা জানে কত কঠিন এমন জিনিশের ভালো লাইভ রেকর্ডিং পাওয়া। যেন সেই বাহুবলী দেখবার পরের মুহূর্তেই যেন মা দুর্গা আমাকে আরও বেশী অনুপ্রাণিত করবার জন্যে এইটি আমার সামনে এনে দিলেন। মুগ্ধ হয়ে শুনে মনঃপ্রাণে এক নতুন শক্তি বইছে। সিনেমা হল থেকে এমনিই একটু বুক ফুলিয়ে বেরিয়েছিলাম। যদিও আজকাল গত ২ বছরে ভালো করে জিম করা হয়নি যেমন আগে করতাম, মাস্টার্স ডিগ্রির চাপে, তাও শরীরটা একেবারে বিগড়ে যায়নি। মাঝে মাঝে একটু দুঃখ পাই কেননা আগের মতন শরীরটা শক্ত শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর নেই বলে, তবে এই প্রভাসের চেহারা দেখে এক নতুন অনুপ্রেরণা পেলাম। মাস্টার্সটা শেষ হলে আবার সেই ময়দানে খেলতে চাই এই প্রভাস আর রানাদের সাথে। উফ, মনে পড়ে এই কিছু বছর আগেরই কথা, ব্রেকফাস্টে ১২টা ডিম আর দুটি বড় সেদ্য আলু খেয়ে ৮-১০ মাইল খুব সহজে দৌড়ে নিতাম, ফুটবলের গোলপোস্টের তলায় পুশাপ আর তারপরে ঝাঁপ দিয়ে পুলাপের চক্র কুড়িখানা আমার ২০০ পাউন্ড ৬ ফুট ১এর চেহারা নিয়ে করতাম। এইগুলি মোট আড়াই বছর আগেকার কথা, আশা করি গৃহস্ত জীবনযাপন করা মানে এমন না হয়ে যায় যে সেগুলি পুরনো স্মৃতিই থেকে যাবে। এ দেশে অনেক ৫০-৬০ বছরের মানুষও দেখি বহালতবিয়তে দৌড়ঝাঁপ করছে। এখনকার জন্যে এই ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টার্সকেই দোষ দেব নিজের শারীরিক পরিস্থিতির এত শীঘ্র বিগড়নোর পেছনে। বাবা অনেকেই হয়, এবং গুছিয়ে নিয়মনিষ্ঠভাবে জীবন চালালে সব কিছুরই সময় বের করে নেওয়া যায়। হে বাহুবলী, সে মনের বল যেন আমি পাই।

পুনশ্চ, দুটি সিনেমাই আমি তেলেগুভাষাতে দেখলাম এবং তার ইংরেজি সাবটাইটেল দিয়ে বুঝলাম। মনে হল অনেক কথা বাঙালিরা বুঝতে পারবে ইংরেজি সাবটাইটেলের সাহায্যে। এইরকম করে সিনেমা বোঝার মধ্যেও এক আনন্দ আছে, যেন পর্দার পেছনে কোন এক সুন্দরী অল্প অল্প করে তার বিভিন্ন সৌন্দর্যের প্রকাশ করছে নিজ মতে। জানি হিন্দিতে ডাব করাও বেরিয়েছে এই সিনেমাটি, কিন্তু জানি না সেগুলো কেমন। এমনিতে তো হিন্দি ডাব করা গুলোও লোকে গিলে খাচ্ছে, হয়ত  হয়নি। ইংরেজি সিনেমা আর কার্টুন হিন্দিতে ডাব করা কিছু দেখেছি, হাস্যকর লাগে, তাই এই ডাবিঙের মামলায় আমার বরাবর সন্দেহ থাকে। তবুও হয়ত হিন্দি ডাবটা দেখতে চাইব একবার অন্তত, না দেখে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না।

সবচেয়ে প্রিয় গান আমার লাগল যখন কুন্থলা রাজ্যের রানী বাহুবলীর প্রেমে পড়ে। এর হিন্দি ও তেলেগুর কথার ভিডিও দিচ্ছি নিচে, সিনেমার থেকে আসল ভিডিও এখনও রিলিজ হয়নি। সুর ও সঙ্গীত পরিবেষণ অতি সুন্দর। ভারতীয় সিনেমার ভক্তিমূলক গান সাধারণত আহামরি হয় না। বলিউডের আগের দুটি বিখ্যাত এই পর্যার গান ছিল মুঘলে আজমের খোয়াজা মেরে খোয়াজা এবং বাজ্রাঙ্গি ভাইজানের ভার দো ঝোলি। যারা এই সুফি সঙ্গীতের জগতে অনর্গল, তাদের কাছে দুটিই বিরক্তিকর এবং ভাবলুণ্ঠনকারি লাগবে। গত ২ দশকে কেবল লাগান সিনেমার ও পালান হারে গানটিই একমাত্র ভালো হয়েছে এই ভক্তিমূলক গানের দিক থেকে দেখলে আমার অনুযায়ী। এই বাহুবলীর বৈষ্ণবগীত আমি সেই উচ্চ পর্যায়ে ধরছি। আমার মতে এইরকম লোকসঙ্গীত যদি পেশ করতে হয় সিনেমার মাধ্যমে, তাহলে সঙ্গীত পরিচালকের নিজস্ব একটা আন্তরিক সম্পর্ক থাকা উচিত সেই শ্রেণীর সাথে যারা এই সঙ্গীতের প্রধান মালিক এবং অনুশীলনকারি। সেটা না থাকলে নকল ভ্যাংচামি হওয়ার সম্ভাবোনা থেকে যায়।