মরুভূমিতে হাজির

অনেকদিন বাদে লিখছি। আমি মাস্টার্স ডিগ্রি সেরে এখন স্বপরিবারে অ্যারিজোনাতে চাকরি নিয়ে এসেছি। অপূর্ব মরুভূমির দেশ। টুসন শহরটির ৪ দিকে পাহাড়, আর মাঝখানের সমতলে শহর। যেদিকেই মুখে করে যাবে, সামনে পাহাড়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুএরই অসাধারণ সৌন্দর্য। যখন এসেছিলাম জুলাই মাসের শেষে, তখন দিনের বেলায় সাংঘাতিক গরম, ১১০ ফারেনহাইট বা ৪৩-৪৫ সেলসিয়াস মতন, আর রাতে ৮০ ফারেনহাইট বা ২৫ সেলসিয়াস। তখন আমি প্রত্যেকদিন সূর্যোদয়ের পুর্বে এই টুমামক হিল নামের এক ছোটো পাহাড় কাজের আগে উঠছিলাম।

20882945_10111721691712661_3154426466494203233_n

20914673_10111721691039011_1258177023003931002_n21034358_10111739845936451_5229436940379258263_n

20914467_10111721692261561_4756324861784172768_n

বাহুবলি দেখার পর যে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল ওই অপুর্ব চেহারা গড়ে তোলবার, সেইটি খানিকটা হয়েওছে এই সুন্দর দৃষ্টি সাতসকালে দেখার সাথে সাথে। ওই পাহাড়ের ওপর অব্দি পৌঁছানো চারটিখানি কথা নয়। একটা পর্যার পর যেন স্রেফ সোজা ওপরে হাঁটো। অদ্ভুত লাগত। ভোরের আগের অন্ধকারে পাহাড় ভরা লোকজনের সেলফোনের আলো নিচ থেকে দেখা যায়, অনেকেই কাজের আগে এই তীর্থযাত্রা সেরে নেয়। ওই নিরিবিলি আঁধারে কেমন যেন সেলফোনের ফ্ল্যাশলাইটগুলি প্রাচীন মোমবাতি লাগে, যেন ভক্তবৃন্দ চলেছে দর্শন করতে পাহাড়ের ওপর পর্যন্ত। এই মুহুর্তে আগে আগে করেই লিখছি কেননা এক মাস হয়েগেছে এখন আর সকালে যাচ্ছি না। মরুভূমিতে গরমও যা, শীতও তেমনি। এখনও লোকে যায় নিশ্চয়, আমি ওই ঠান্ডা হাওয়া খেতে পারি না। আবার মার্চ মাসে বোধয় আবহাওয়া আমার পক্ষে মানাবে। টুসনের আরেকটা সুন্দর বস্তু হল তার বিশাল বিশাল ক্যাকটাস গাছ, মানে ২০-২৫ ফুট লম্বা। জন্তু জানোয়ার বলতে এখানে বিষাক্ত সাপ আছে যেমন র‍্যাটেলস্নেক, আর বিষাক্ত কাঁকড়াবিছাও আছে, আর বেশ বড় বড় দুপায়ে দৌড়ানোর মতন টিকটিকি গিরগিটি আছে। তাই বাইরে একটু সচেতন হয়ে চলাফেরা করতে হয়। মাঝেসাঝে হরিণ দেখতে পাই, কিন্তু বড় কিছু মাংসাশী নেই যেমন ভাল্লুক বা নেকড়ে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে মাস্টার্স শেষ আর অ্যারিজোনাতে চাকরি শুরুর মাঝে এক মাস কলকাতা গেছিলাম। আসলে সেখানেই শরীর চর্চা নতুন করে শুরু করতে পারলাম ওই এক মাসের ছুটিতে। ভোর সকালে রবীন্দ্র সরোবর পুকুরের চারিদিকে আড়াই মাইল দৌড়ে বাড়ি এসে জলখাবার খেয়ে অ্যান্ডারসন ক্লাবে গিয়ে সাঁতার কাটতাম। তারপর দুপুরের জলখাবার খেয়ে বিকেলে আনোয়ার শাহ্‌ রোডের ছোট জিমে ওজনটোজন তুলতাম। আর সবচেয়ে সাংঘাতিক প্রায়শ্চিত্ত এই, যে গোটা এক মাসে আমার মতন মিষ্টি হ্যাংলা হয়ত ৫-৬বার মিষ্টি দই খেলো।

অন্য খবরে আমি আমার মাথার চুল সমস্ত কামিয়ে ফেলেছি। ঘন চুল আমার বরাবরই ছিল, কিন্তু ২৩-২৪ বয়স থেকে কিরকম মাঝখানের চুলটা হালকা হতে লাগল, আর পাশের চুলগুলো তেমনিই ঘন রয়ে গেল। অনেক বছর পাশের চুলগুলো মেশিন দিয়ে কামিয়ে রাখতাম প্রত্যেক ২ সপ্তাহ অন্তর। এখনও সেরকম করে চালিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু কি লাভ। এমনিতেই কাজের লাইনে প্রত্যেকদিন মুখটা কামাই, তো এখন পুরো মাথাও একই সাথে কামিয়ে ফেলি। আগে মাথার চুল আর মুখের গোঁফ দাড়ি নিয়ে পেকো মোল্লা মতন লাগত। এখন ন্যাড়া মাথা আর বিনা গোঁফ দাড়িতে নিজেকে বেশ চৈতন্য মহাপ্রভু মতন লাগছে। তাও দৌড়ঝাঁপ করি বলে খারাপ লাগছে না, আমার তো নতুন রূপ ভালোই লাগছে। বউ আমার মেয়েকে শেখাচ্ছে আমার মাথায় টাকডুমাডুম করতে। মন্দ কি?

Advertisements

ভাবের ব্যাপার

কবিতার কথা জানার আগে গান শুনি, তারপর দুএকটা লাইন ইন্টার্নেটে দি, সেখান থেকে কবিতার কথা বের করি, তারপর আরও মত্ত হই সুরে। এটি এক ভাবের ব্যাপার।

কি অপূর্ব দৃষ্টি। খোলা আকাশ, খালি সুদ্ধ গলা, কেবল একটা একতারা আর খরতাল আর আরধেক তবলা। দর্শকের গুন্ডামার্কা মুখ দেখে নিজের সাথে মিল লাগল। আসলে এই পর্যায়ে সঙ্গীত অনুভব করলে মুখভঙ্গি অমনিই হয়ে যায় আর কি। এটি একটি ভাবের ব্যাপার।

গানের কথা খুঁজতে অন্য গানের মতন অসুবিধে হয়নি, কারণ এইটি লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গোষ্ঠ গান, এখানে দিলাম

বলাই দাদার দয়া নাই প্রাণে

গোষ্ঠে আর যাবনা মাগো

দাদা বলাইয়ের সনে ॥

 

বড় বড় রাখাল যারা

ওমা, বসে বসে থাকে তারা

আমায় করে জ্যান্তে মরা

বলে ধেণু ফিরা’ নে ॥

 

ক্ষুধাতে প্রাণ আকুল হয় মা

ধেণু রাখার বল থাকে না ॥

বলাই দাদা বোল বোঝে না

কথা কয় হেনে ॥

 

বনে যেয়ে রাখাল সবাই

বলে এস খেলি কানাই

হারিলেই স্কন্ধে বলাই

চড়ে তখনে ॥

 

তোরা যা সব রাখালগণে

আমিতো যাবো না বনে

খেলব খেলা আপন মনে

ফকির লালন তাই ভণে ॥

 

আরেক গান, যেখানে সেই ভাবটার দর্শন পেলাম।

এ ধন যৌবন চিরদিনের নয় ।
অতি বিনয় করে নিমাই মায়েরে কয় ।।

কেউ রাজা কেউ বাদশাগিরি
ছেড়ে নেয় অধীন ফকিরি
আমি নিমাই, কি ছাড় নিমাই
ধন ছেড়ে বেহাল লয়েছি গায় ।।

যখন হাওয়া বন্ধ হবে
এই দেহ শ্মশানে যাবে
তখন কুঠাবালাঘর, কোথা রবে কার
ভবের লোভ-লালসে দুকূল হারায় ।।

যাও শচীমাতা গৃহে
আমারে বিসর্জন দিয়ে
এই বলে নিমাই, ধরে মার পায়
ফকির লালন বলে ধন্য ধন্য নিমাই ।।

বাহুবলী ২

কি ব্যাপক সিনেমা বানিয়েছে বাপরে। প্রাচীনকালের ভিত্তিতে গড়া সিনেমা এরকম শুধু হলিয়ুডেরই দেখেছি আজ পর্যন্ত। রাসেল ক্রোয়ের গ্ল্যাডিয়েটর সিনেমা মনে পড়ে, আর তারপর বলব গত দশকে ট্রয়, ৩০০ আর অ্যালেক্সান্ডার এইরকম পর্যায় হয়েছে। ভারত থেকে কেবল বলিউডেই দমবন্ধ হতে হয়েছে ওদের ফালতু শারুখ খানের আশোকা সিনেমার মতন ভন্ডামি দেখতে। হ্রিত্বিকের মুঘলে আজম সিনেমাও সেই বোকা বোকা লাগে দেখতে এই ট্রয় গ্ল্যাডিয়েটরের সামনে। তবে বাহুবলী দেখে প্রথমবার গর্বের সাথে বলতে পারি এই দেখ ভারতের প্রাচীন সভ্যতাকে ভিত্তি করে কি সুন্দর চলচ্চিত্র তৈরি করা যায়। বাহুবলী ১ আমি দেখেছিলাম সিনেমা হলে যখন বেরিয়েছিল। ওই সিনেমাটার শেষের অংশটি ভালো বলা যায়, বিশেষ করে কালাকেয়া মহাজাতির সঙ্গে যুদ্ধের পর্বটি। প্রথম পর্বটি গ্রাফিক্স ভালো হলেও খুবই আস্তে আস্তে চলছিল। আর মেয়েকে পটকানোর ব্যাপারে সেই দিল সের মতন গল্পের লাইন, ধীরে ধীরে জোর করে মেয়েকে যাহোক করে পটকানো, এর পেছনে এক ঘন্টা কাটানোর জন্যে আমি এই প্রথম বাহুবলীর বিশেষ ভক্ত নই। তবে এই দ্বিতীয় ভাগে গল্প ওই বলিয়ুড/টলিয়ুডের স্টিরিওটিপিকালভাবে এগোয়েনি। স্পষ্ট এবং অস্পষ্টভাবে সনাতন ধর্মের উপমা ব্যবহার করে গল্পটি সিনেমা থেকে যেন দর্শনে পরিণত হয়ে গেল। রাত্রিবেলায় ফাঁকা থিয়েটারে একলা আমি (স্ত্রী আমার আগের শোটা দেখতে গেছিল, এই হল কচি বাচ্চা হওয়ার পরিণাম) বসে এমন অনুপ্রাণিত হলাম, যে সিনেমার শেষে স্ক্রিনের দিকে হাত জোড় করে নমঃ করতে উচিত বোধ করলাম। বাড়ি ফেরার পথে মাঝরাত্রে গাড়ির কাঁচ খানিকটা নামিয়ে ডিসি বেল্টওএর হাওয়া খেতে খেতে আমি মে মাসে দুর্গা পূজার এই সাংঘাতিক ঢাক বাজনা শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরলাম।

এই উপরের সম্মোহিত ঢাক বাজনা ইউটিউবে খুঁজে পাওয়াকেও এক মহাভাগ্যবানভাবে মনে করি, কেননা বেশীরভাগ ঢাক বাজনা এরকম পাওয়া মুস্কিল। যারা ইউটিউবের চর্চা করেন, তাঁরা জানে কত কঠিন এমন জিনিশের ভালো লাইভ রেকর্ডিং পাওয়া। যেন সেই বাহুবলী দেখবার পরের মুহূর্তেই যেন মা দুর্গা আমাকে আরও বেশী অনুপ্রাণিত করবার জন্যে এইটি আমার সামনে এনে দিলেন। মুগ্ধ হয়ে শুনে মনঃপ্রাণে এক নতুন শক্তি বইছে। সিনেমা হল থেকে এমনিই একটু বুক ফুলিয়ে বেরিয়েছিলাম। যদিও আজকাল গত ২ বছরে ভালো করে জিম করা হয়নি যেমন আগে করতাম, মাস্টার্স ডিগ্রির চাপে, তাও শরীরটা একেবারে বিগড়ে যায়নি। মাঝে মাঝে একটু দুঃখ পাই কেননা আগের মতন শরীরটা শক্ত শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর নেই বলে, তবে এই প্রভাসের চেহারা দেখে এক নতুন অনুপ্রেরণা পেলাম। মাস্টার্সটা শেষ হলে আবার সেই ময়দানে খেলতে চাই এই প্রভাস আর রানাদের সাথে। উফ, মনে পড়ে এই কিছু বছর আগেরই কথা, ব্রেকফাস্টে ১২টা ডিম আর দুটি বড় সেদ্য আলু খেয়ে ৮-১০ মাইল খুব সহজে দৌড়ে নিতাম, ফুটবলের গোলপোস্টের তলায় পুশাপ আর তারপরে ঝাঁপ দিয়ে পুলাপের চক্র কুড়িখানা আমার ২০০ পাউন্ড ৬ ফুট ১এর চেহারা নিয়ে করতাম। এইগুলি মোট আড়াই বছর আগেকার কথা, আশা করি গৃহস্ত জীবনযাপন করা মানে এমন না হয়ে যায় যে সেগুলি পুরনো স্মৃতিই থেকে যাবে। এ দেশে অনেক ৫০-৬০ বছরের মানুষও দেখি বহালতবিয়তে দৌড়ঝাঁপ করছে। এখনকার জন্যে এই ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টার্সকেই দোষ দেব নিজের শারীরিক পরিস্থিতির এত শীঘ্র বিগড়নোর পেছনে। বাবা অনেকেই হয়, এবং গুছিয়ে নিয়মনিষ্ঠভাবে জীবন চালালে সব কিছুরই সময় বের করে নেওয়া যায়। হে বাহুবলী, সে মনের বল যেন আমি পাই।

পুনশ্চ, দুটি সিনেমাই আমি তেলেগুভাষাতে দেখলাম এবং তার ইংরেজি সাবটাইটেল দিয়ে বুঝলাম। মনে হল অনেক কথা বাঙালিরা বুঝতে পারবে ইংরেজি সাবটাইটেলের সাহায্যে। এইরকম করে সিনেমা বোঝার মধ্যেও এক আনন্দ আছে, যেন পর্দার পেছনে কোন এক সুন্দরী অল্প অল্প করে তার বিভিন্ন সৌন্দর্যের প্রকাশ করছে নিজ মতে। জানি হিন্দিতে ডাব করাও বেরিয়েছে এই সিনেমাটি, কিন্তু জানি না সেগুলো কেমন। এমনিতে তো হিন্দি ডাব করা গুলোও লোকে গিলে খাচ্ছে, হয়ত  হয়নি। ইংরেজি সিনেমা আর কার্টুন হিন্দিতে ডাব করা কিছু দেখেছি, হাস্যকর লাগে, তাই এই ডাবিঙের মামলায় আমার বরাবর সন্দেহ থাকে। তবুও হয়ত হিন্দি ডাবটা দেখতে চাইব একবার অন্তত, না দেখে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না।

সবচেয়ে প্রিয় গান আমার লাগল যখন কুন্থলা রাজ্যের রানী বাহুবলীর প্রেমে পড়ে। এর হিন্দি ও তেলেগুর কথার ভিডিও দিচ্ছি নিচে, সিনেমার থেকে আসল ভিডিও এখনও রিলিজ হয়নি। সুর ও সঙ্গীত পরিবেষণ অতি সুন্দর। ভারতীয় সিনেমার ভক্তিমূলক গান সাধারণত আহামরি হয় না। বলিউডের আগের দুটি বিখ্যাত এই পর্যার গান ছিল মুঘলে আজমের খোয়াজা মেরে খোয়াজা এবং বাজ্রাঙ্গি ভাইজানের ভার দো ঝোলি। যারা এই সুফি সঙ্গীতের জগতে অনর্গল, তাদের কাছে দুটিই বিরক্তিকর এবং ভাবলুণ্ঠনকারি লাগবে। গত ২ দশকে কেবল লাগান সিনেমার ও পালান হারে গানটিই একমাত্র ভালো হয়েছে এই ভক্তিমূলক গানের দিক থেকে দেখলে আমার অনুযায়ী। এই বাহুবলীর বৈষ্ণবগীত আমি সেই উচ্চ পর্যায়ে ধরছি। আমার মতে এইরকম লোকসঙ্গীত যদি পেশ করতে হয় সিনেমার মাধ্যমে, তাহলে সঙ্গীত পরিচালকের নিজস্ব একটা আন্তরিক সম্পর্ক থাকা উচিত সেই শ্রেণীর সাথে যারা এই সঙ্গীতের প্রধান মালিক এবং অনুশীলনকারি। সেটা না থাকলে নকল ভ্যাংচামি হওয়ার সম্ভাবোনা থেকে যায়।

অট্টাল

গতকাল রাত্রে নেটফ্লিক্সে মালায়ালাম ভাষার সিনেমা দেখলাম অট্টাল। কি সুন্দর গল্প এবং পরিচালনা। গল্পটি রাশিয়ান লেখক অ্যান্টন চেখভের বাঙ্কা থেকে তোলা, কিন্তু খুব উপযুক্তভাবে কেরলের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে গেঁথেছেন পরিচালক। বড় গল্পের সাথে সাথে অনেক ছোটখাট বিষয়ও দেখিয়েছে গল্পে, যেমন বিনা সচেতন প্রচেষ্টাতেই কিভাবে সাধারণ পরিবারেরাও নিচের আর্থিক স্তরের মানুষের রক্ত চোষে, তাদের বিনিময় মায়ার জগতে জয়ী হয়, এইসব। শেষে দাদু যখন অনাথ নাতিকে বাজির কারখানায় পাঠিয়ে দেন, তখন আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। কোনদিন সিনেমা দেখে এরকম অন্তরে টান দেয়নি যেমন এই সিনেমা দেখে লাগল। কুট্টপ্পয়িএর সাথে কেমন জানি আমার অন্তরের মিল লাগল। আমি সুখী যে আমি দাদুদিদাদের সাথে বড় হতে পেরেছি, তাদের থেকে অঙ্ক থেকে ইতিহাস শিখেছি। তাদের থেকে আমাকেও জীবন এক কাল ছিঁড়ে নিয়েছিল। তাদের সঙ্গের সাথে সাথে আমার জন্মস্থানও ছিঁড়ে গেছিল আমার জীবন থেকে। অন্তরের সে ধাক্কা থেকে কি আমার উদ্ধার কোনদিন হবে? যত সময় যায়, এ ধাক্কার প্রভাব যে কমে না, কেবল বাড়তেই থাকে।

মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কিছু মনের কথা

বর্তমান ধারা অবাধ রেখে দিলে আর একদেড়শো বছরে বাঙলার স্থান অন্তত পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতালি বা সংস্কৃত ভাষার মতন উবে যাবে। অনেকেই আছে যারা দিনকেদিন নতুন প্রজন্মের ওপর নিন্দে করে, তাদের ঘাড়ের ওপর দোষ চাপায় মাতৃভাষার এই পরিণতি দেখে। আমার বড় হওয়াকালীন শুনতাম যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা বাঙলা বই পড়েই না। এখন শুনি আমার প্রজন্ম থেকে যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা বাঙলাতে কথাই বলে না। আচ্ছা, দোষ দিয়ে কি লাভ? নিন্দে করে কি লাভ? বর্তমান তো আর চাঁদমামা থেকে টপকে সেদিন উদয় হয়নি। বর্তমান ইতিহাসের ফল, ও ভবিষ্যৎ বর্তমানের ফল। এই হল বাস্তব।

আমি কেন বাঙলায় বই পড়িনি? কেন আজও, যে গতিতে আমি একটি ইংরেজিতে লেখা পড়ে ফেলতে পারি, সে সোমান গতিতে কেন একটি বাঙলা লেখা পড়তে পারি না? হয়ত কিছু কিছু কথা বুঝতে পারি না। তাও চালিয়েনি আগের সামনের বাক্য পড়ে। হয়ত কোন এক পর্যায়ে আর তা করে টেঁকা যায় না। নির্লিপ্ত হয়ে পড়ি। কেন এত ন্যাজেগবরে অবস্থা আমার নিজ মাতৃভাষার শব্দকোষের? কেন ইংরেজির অঙ বঙ চঙের পর্যায়ের লেখা আমি বিনা অসুবিধায়ে গড়গড় করে পড়ে যেতে পারি, কিন্তু বাঙলায় তা পারি না? কি কারনে নিজের ভাষায় অনর্গল হওয়াটি এক বিশাল মহা তপস্যা? যে জিনিসটা এক অপরের ভাষায় স্বাভাবিকভাবে গড়েছে, সেটা নিজ ভাষায় হয়নি কেন? এমনকি তার উল্টোটাই তো আমার মতে স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল, তাই না? এটা কি ১৭৫৭ সালের পলাশী মাঠের ফল আজও ভোগ করছি? ইতিহাসের সমস্ত দুর্ঘটনাই কি বর্তমানের পক্ষে নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে? আর ভবিষ্যতের ব্যাপারে কি মানুষ এতই হাতপাবাঁধা?

আসলে ভাষার স্থান মানুষের জীবনে এক পরিপুর্ন উপযোগিতার ব্যাপার। ভাষা দিয়ে যেমন মানুষ সাহিত্য লেখে, তেমনি ভাষা দিয়ে মানুষ অঙ্ক কষে। যেমন ভাষা দিয়ে সে ফল কেনে, তেমনি ভাষা দিয়ে সে ভালোবাসা প্রকাশ করে। সে ভালোবাসা প্রকাশ করারও নানান পর্যায়ে সে সেই ভাষার ব্যবহার করে, সে কামে মগ্ন ভাবেই হোক, বা অচেনা অজানা মনের মানুষকে চিঠি লেখাই হোক। সবেতেই এক ভাষা মানুষকে ধরে রাখে, তাকে সম্পুর্ন করে তোলে। মাতৃভাষার টান প্রত্যেক মানুষের কাছে ভিন্নভাবে উত্তম বাকি ভাষার তুলনায়। এর সাথে তার পুর্বপুরুষের কর্মকান্ড জড়িত থাকে। কোন না কোন ভাবে এক আধ্যাত্মিক দিক থেকে প্রত্যেক মানুষের সে মাতৃভাষার প্রতি এক টান এবং তার চেয়েও জরুরি এক দক্ষতা থাকে।

আমরা যেটা করেছি, হচ্ছে এক অনাসৃষ্টি বিভাজন ভাষা কে নিয়ে। কাজের কাজ বলতে আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাঙলা কে জয়ী করিনি। বাঙলাকে জোর করে ফেলে রাখা হয়েছে মগজের ডানদিকে, যেদিক থেকে উদয় হয় শিল্পকলা, সাহিত্য, কাব্য, সৃজনশীলতা, ইত্যাদি। কিন্তু বাঙলাতে কেউ ডাক্তারি পড়তে পারবে? কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং? আমি কি ড্রোন টেকনোলজি নিয়ে চর্চা কোথাও ছাপতে পারব বাঙলাতে? কেউ কি আছে যে সে পর্যার অঙ্ক এবং বিজ্ঞান বাঙলায় পড়েছে, গবেষণা করেছে? অতএব বাঙলার মূলত কোন কাজ নেই কেবল মনের শান্তনা দেওয়া ছাড়া। আমরা বাঙলাকে এক অস্বাভাবিক মোড়ে ফেলে এসেছি। “বাঙলাতে কত ভালো”, এক ধরনের প্রশংসা। কিন্তু এ কথার পেছনে দুতিনটে প্রক্রিয়া মাথার পেছনে চলে, এটা ভেবে দেখা উচিত। বাঙলাতে কত ভালোর মানে হল যে সে ব্যক্তি নিজের সময় বের করে একটি অতিরিক্ত জিনিশ গ্রহণ করেছে। বাঙলাতে ভালো হওয়া মানে ক্যারাটেতে ভালো হওয়া (সবারই ক্যারাটে জানলে ভালো হয়, কিন্তু সবাই না জানলেও ঠিক আছে, যারা জানল, তাদেরই “ভালো”)। তাও বা আজ বাঙলায় ভালো হওয়ার উপযোগিতা ক্যারাটের সোমান। আর চার-পাঁচ দশকে বাঙলায় ভালো হওয়া আর তিনটে বল নিয়ে ভেল্কি করাও এক পর্যায় থাকবে।

এসব ব্যাপারে অন্যান্য বাঙালিদের বললে তারা আঁতকে ওঠে। তাদের বাঙলাভক্তি গল্পের বই, সিনেমা, কবিতা, গান, কেবল এগুলোতেই থাকে। তবে উল্টে দোষ দেবে যে আগামী প্রজন্ম বাঙলায় কথা বলছে না, কিন্তু নিজেরা কি বোঝে যে তারা বাঙলাকে কেবল এক মিউজিয়ামের টুকড়ো বানিয়ে তারা নিজেরাই সে পরের প্রজন্মের অবস্থা আগের থেকে ঠিক করে দিয়েছে? স্বাধীন ভারতে ৪৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যদি তক্ষুনি সমস্ত বিশ্বের বিজ্ঞানকে বাঙলানুবাদ করে নেওয়া হত, যদি সমস্ত উচ্চশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক চর্চা বাঙলাতে করার মতন প্রতিষ্ঠান গড়া হত, তাহলে কত ধরনের উন্নতি হতে পারত। এক অপর ভাষার (ইংরেজি) চাপ দিয়ে মানুষের দক্ষতাকে বেকার দমিয়ে রাখতে হত না। হয়ত নিজ মাতৃভাষায় লক্ষ কোটি চাষার মধ্যে থেকে নতুন ভাবে ধান ফসল করার গবেষণা আসত। হয়ত বাঙলার জেলেরা কিভাবে মাছ ধরা যায় টেকসইভাবে, তা নিয়ে লিখত কোন বাংলাভাষী পঞ্জিকাতে। আর হ্যাঁ, অবশ্যই বাঙলায় জোর দেওয়া মানে নয় যে বাকি পৃথিবীর থেকে সরে যাওয়া। সে পঞ্জিকাগুলোই অন্যান্য ভাষাতে অনুবাদ হত, আবার বিশ্বের অন্যান্য জার্নাল ইত্যাদি বাঙলাতে অনুবাদ করা যেত। জাপানি, কোরিয়ান, এদের সাথে কি আমেরিকানরা কম কাজ করে? ওরা তো নিজেদের ভাষাতেই সমস্ত কাজ করে। যখন প্রয়োজন হয়, তখন দুদিকেই অনুবাদক থাকে।

এই ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়া নিয়ে এরকম উল্টে নিজের জাতিকে দুনম্বরি সাহেব বানানো, এতে কেবল ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফ্রিকার উপমহাদেশ, এ দুই জায়গাই নিজেদের স্বাধীন দেশের এ হাল করেছে। ভাষা ভোলার চেয়েও আরও বেশী অমানুষিক প্রক্রিয়া হচ্ছে দারিদ্রতা। যারা নিজ মাতৃভাষায় নিজেদের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে, তারা তাদের সমাজের তালা খুলে ফেলতে পেরেছে, এবং তারা অনেক উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। এ দুনম্বরি সাহেব হওয়ার ধান্দায়ে যাও বা হবে, তা হচ্ছে কেবল অসংখ্য মানুষের কারনে। হ্যাঁ, দেড় বিলিয়নের মধ্যে অনেকই অতি মেধা মানুষ থাকবে যারা অপরের মাতৃভাষা নিয়েও তা দিয়ে অঙ্কে ভালো হবে, মহাকাশ গবেষণা করবে, এসব। কিন্তু নিজের ভাষার দরজা যদি খোলা থাকত, তাহলে ইস্রোর আজ অবদি যা সংসাধন হয়েছে, তার সোমান আমরা ভারতের প্রত্যেকটি রাজ্যের নিজস্ব মহাকাশ প্রতিষ্ঠান থেকে পেতাম। হয়ত ভারত থেকে ইন্টারনেট প্রথম বেরুত, বা সেলফোন। বা হয়ত অন্য এমন এক জিনিশ যা পৃথিবীর মানুষের হাতছাড়া আজকে কেননা আমরা নিজ মাতৃভাষাদের তার প্রাপ্য বল দিইনি।

আজও সম্ভবতা আছে কিছু করার। বাঙলা মিডিয়াম কলেজ ইউনিভার্সিটি খুললে যে সে প্রতিষ্ঠানটি পাকা থাকবে না, এরকম পরাজিত মনের আমি নই। প্রথম প্রথম বাংলাভাষী মানুষই আসবে পড়তে, হয়ত অতি গরীব পরিবার থেকে, কিন্তু তারা আসবে। তাদের মধ্যে মেধা ও দক্ষতা থাকবে, যা তাদের নিজ মাতৃভাষায় কাজ করার কারনে তার থেকে এক নুতন দক্ষতা আসবে যা এখন অবদি ভারতে নেই। অধ্যাপক প্রথম প্রথম হবে যারা ইংরেজিতেই নিজেদের কাজ শিখেছে আর বাঙলাটা কেবল ওই সাহিত্যিক কারনে কিছু ধরনের সক্ষমতা আছে। অভ্যাসের সাথে ওরাও নিজ মাতৃভাষায় সে কাজ করতে সফল হবে। যারা পাস করে বেরুতে থাকবে, তাদের মধ্যে কেউ নিজেদের কোম্পানি খুলবে। হয়ত কেউ এমন প্রোডাক্ট তৈরি করবে যা বিশ্ব বিখ্যাত হবে, আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হবে, তারাও হয়ত তাদের পুরনো ইউনিভার্সিটিতে পয়সা ঢালবে। মানে এই তো হল ভালো একটা মিথোজীবী সুস্থ সমাজ।

আসল কারন যদি কেউ খোঁজে যে কেন ভারতীয়য় উপমহাদেশ ও আফ্রিকাতে নিজ মাতৃভাষাদের ডোবানো হয়েছে, তাহলে খানিকটা বিশ্লেষণ করলেই তা বের করে নেওয়া যায়। এ দেশগুলি যখন স্বাধীন হয়, তখন সাহেবদের এ দেশগুলিতে কিছু কেরানিরা ছিল, যারা তখনকার সমাজে এক অতি ছোট কিন্তু বিশালভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক অংশ ছিল। তারা নিজেদের কাজ ও সমাজে অর্জন করা স্থানের নিরাপত্তার কারনে চায়নি যে দরজা খুলে যাক। তাদের স্বার্থ ছিল, সে পাকা চাকড়ি নিজের থাক। ইংরেজি ভাষার প্রধানতা সমস্ত ভালো চাকড়ি ও উচ্চশিক্ষায় রেখে তারা নিজেদের ছেলেপুলেদের জন্যেও যতটা সুবিধে দেওয়া যায়, তা যাচাই করে নিল। আমেরিকাতে আজকাল অনেক চর্চা হয় “প্রিভিলেজ” সম্বন্ধে। গবেষকরা বহু জটিলভাবে লক্ষ্য করেছে কত ধরনের জিনিশ মানুষের জীবনে তাকে এক বিশেষ সুযোগ দেয় অন্য মানুষের চাইতে। এ চর্চা দেখে আমি বুঝেছি যে ভারতে সাহেবদের কেরানিরা যেভাবে প্রিভিলেজ নিজেদের জন্যে বজায় রেখেছে, আর কেউ পৃথিবীতে বোধয় তা করেনি (হয়ত আফ্রিকাতেও তাই, কারন ওরাও একই পর্যায়)। ভাবুন, দুইটি পরিবার, একটির বাবামা দুজনেই  ইংরেজিতে দুতিন প্রজন্ম ধরে ফ্যাটফ্যাট করে, অন্যটির বাবা হয়ত অল্প কিছু ইংরেজি বোঝে, কিন্তু তেমন কিছু আহামরি না, আর মা বোঝেই না। প্রথম পরিবারের ছেলে অঙ্ক ও বিজ্ঞানে মাঝারি, দ্বিতীয় পরিবারের ছেলে এই আসল বিষয়তে অত্যন্ত মেধা, কিন্তু ইংরেজিতে কাঁচা ঠিক বলব না, কিন্তু পুরদস্তুর ভাবে তার বাড়িতে কেউ ইংরেজি না জানার ফলে তার ছাত্রজীবনে এই ভাষার ব্যাপারটি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। হ্যাঁ, বলা যায় যে সে সত্যিকারের মেধা হলে ভাষার ব্যাপারটি কিছুই নয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, যে তাকে কেন সার্কাসের বাঘের মত আগুণের চক্করের মধ্যে দিয়ে লাফাতে হবে? হয়ত দুএকজন মেধা ছাত্র পারবে। কিন্তু এক বিশাল সমাজকে দমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে এর কারনে। আর এত ইংরেজি জেনে কি করছে? সাহেবদের কম্পিউটার সারাচ্ছে যতদিন দেশ গরীব আছে আর মাল্টিন্যাশনালদের কাছে ভারতে ২০,০০০ ডলারে সে এক নিচ পর্যায়ের কাজ চুকে যায় যা আমেরিকাতে ৬০,০০০ লাগত। সাহেবদের কুলি হবার জন্যে কি এই ইংরেজি বিদ্যা ধরে রয়েছি?

এর পরও যখন লোকে বলে যে “নতুন প্রজন্ম” বাংলাভাষার বধনাম করছে, বিশেষ করে যখন তাদের জীবনী থেকে বোঝা যায় যে তারা নিজেরা কতরকম ভাবে এই ইংরেজিভাষার প্রিভিলেজ থেকে সুবিধে নিয়েছে লক্ষ্য কোটি দেশের মানুষের আর্থিক বিনিময়ে, তখন বড্ড রাগ ধরে। আর গরীব বা গ্রাম্য পরিবারের ছেলেমেয়েদের আজকাল যখন দেখি কিছু শিক্ষার প্রগতির ভিডিও ইত্যাদিতে যে তারা ইংরেজিতে কথা বলছে আর তাদের চাষা মাবাপেরা মুগ্ধ হয়ে হাঁ করে রয়েছে আর মায়েদের চোখে কান্না আসছে, আমি সে বলিউডে ভাসি না। আমার মাথায় সে সোমান ভিডিও চলে, এক মেমসাহেব মা, সুইতজারল্যান্ডের গরুর দুধ বের করে নিজের ঘরে ঢুকলেন। তাঁর নীল চোখ হলদে চুল মুখে ফোটা ফোটা লাল দাগ মারা ৫ বছরের মেয়ে বাড়ি এসে মারাঠিতে বলল চারটি কথা, আর সে মেমসাহেবের চোখে জল এল। হাস্যকর ব্যাপার সত্যি।

ইংরেজির বেশী ব্যবহার আমি করি না এই মঞ্চে, বা চেষ্টা করি না করতে। তবে কি করা যায়, ইংরেজি তো প্রতি বিলে গুঁজে রয়েছে। তাও একটি কথা দিয়ে শেষ করব যার ইংরেজির থেকে বাঙলা অনুবাদটা ঠিক হবে না মনে হয়। Charity begins at home. এই মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমি আশা করছি যে বিশ্বের গোটা বাঙালি জাত, ভারত, বাংলাদেশ এবং এদের প্রবাসী যারা, আমাদের মধ্যে কেউ যেন এই ২১এ শতাব্দীতে কিছু একটা করা আরম্ভ করে যাতে আমাদের এই মাতৃভাষা কেবল মঞ্চের কবিতা আবৃত্তিতে আটকে যায় না। এর পেছনে আর্থিক শক্তি চাই। আর্থিক শক্তি বিনা সংস্কৃতি টেঁকে না। এই ব্লগের আগের লেখাতেও আমি এই কথার উল্লেখ করেছি, আবার করছি। আমাদের সাংস্কৃতিক যাই সম্পদ আজ রয়েছে, সেগুলি ৭০০০ বছরের জন্যে পৃথিবীর সেরা অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার কারনে। অর্থ ও মানসিক সভ্যতা হাতে হাত মিলিয়ে চলে। দুটোকে আলাদা করলে আর্থিক ব্যাপারে দরিদ্র থাকব, আর তার সাথে সাথে সংস্কৃতিটাও উঠে যাবে। Survival of fittest কথাটিও এক বাস্তব। Fit হতে হবে, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে টেনিদা, সবাই তা বলে গেছেন।

হুশিয়ার সাবধান

আমি অনেক বছর ধরে নরেন্দ্র মোদীর ক্রমবিকাশ দেখে আসছি, সেই যবে থেকে গুজরাট প্রদেশে ভূমিকম্প হয়েছিল, তবে থেকে বুঝেছিলাম এই ব্যক্তি অন্য ধরনের। রাজনীতিতে বেশীরভাগ মানুষ জড়িত হয় যুববয়সে সমাজের প্রতি চরম শ্রদ্ধা ও কল্যানের ইচ্ছা থাকলে। আমি জানি আমার প্রজন্মে বিশেষ করে এক অসীম অসূয়া মনের মধ্যে ঢুকে গেছে এ নিয়ে, কিন্তু আমি মনে করি মানুষ গোঁড়াতে ঠিক উদ্দেশ্যেই আসে এতে। তারপর সে ব্যক্তি তার নিজস্ব শক্তি আর গাফিলতির মধ্যে দিয়ে তার রাজনৈতিক সম্পাদন প্রকাশ করে। এই হল গিয়ে পার্থক্য এক সৎ আর অসৎ নেতার মধ্যে। আমি ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকেও সৎ হিসেবে মানি, আর মমতা আর কেজ্রিওয়ালদেরকে রাবণের অবতার হিসেবেও দেখি না, নাই বা কৃষ্ণের। এরা মাঝারি পর্যায়।

শ্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে সে সততা আমি অনুভব করি তার ভাষণ থেকে, তার আচরণ থেকে। তার রাজনৈতিক জীবনে কেবল একটি গাফিলতি হয়েছে যেইটি হচ্ছে গুজরাটের দাঙ্গা থামানো নিয়ে। আমি সেই দাঙ্গাকে অন্য চোখে দেখি। ৯০ দশকে আমরা বেশীরভাগ এই লালু, দেবে গউডা, মুলায়ম, মায়াবতী ইত্যাদি, এদের কোয়ালিশন সরকার দেখেছিলাম, যেখানে এ ওকে ওখান থেকে চুরি করতে দিচ্ছিল, আর উল্টে এ একে এখান থেকে চুরি করতে দিচ্ছিল। সেই দশকের এই রিজানাল দলদের ফর্মুলা ছিল গরীব মুসলিম জনসংখ্যাদের কিছু তোষণ করে তাদের ভোট নাও, আর তার সাথে কিছু জাতিভেদের নামে দুএকটা আরও সমাজের ভোট নাও, গদি দখল কর, আর ফের চুরি কর। এতে কারুরই লাভ হচ্ছিল না, সমস্ত দেশ বিগড়চ্ছিল, আর দাঙ্গা দিনকেদিন হচ্ছিল ছোটোখাটো সারাক্ষণ কারণ মানুষকে গরীব আর বেকার রেখে দিলে ওর আর কিছু করার থাকে না। সেই জঘন্ন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে এক ধরনের বলিদানের দরকার ছিল। লক্ষ কোটি মানুষ অনাহারে মরার চেয়ে ২০০০জন খুন হয়ে তারপর সুরাজ্য আনা যতই টেকনিক্যালি খারাপ বলা যায়, আমি সেভাবে দেখি না। মানুষের জীবনের দাম এমনিতেই এত কমে গিয়েছিল সে সময়তে, আমি আর ইতিহাস সেই ২০০০জনের বলিদানকে সেইভাবেই দেখবে ভবিষ্যতে, যার বিনিময় মোদীকে আমরা হয়ত চিনতাম না। সেই দশকের অসহায়তা প্রকাশ করেছিল খুব ভালো করে কয়েকটা সিনেমা যেমন আমির খান আর নাসিরুদ্দিন শাহের সারফারোশ, আর নানা পাটেকার ডিম্পেল কাপাডিয়ার ক্রান্তিবীর। আমি এই দুটি সিনেমা নতুন করে দেখলাম মোদীজির ৫০০/১০০০ টাকার বাতিলতার ঘোষণার পর। এক আনন্দ এল মনে বহু বছর যা জানতাম না, যে আনন্দ ছোটবেলার থেকে বাস্তব ছিনিয়ে নিয়েছিল সাধারণ জীবন থেকে।

যখন উনি দর্ষকদের বলেন  দাঁড়াতে, তাকে আশীর্বাদ দিতে, তার গলার টান যখন বলে “ইমানদার লোগ”, এতে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তারপর যখন কথা এগোয়ে যে তিনি কাদের সাথে লড়াই তুলেছেন, আমার মন তখন ওই সারফারোশ সিনেমার দিকে গেল। মোদীজি, আপনি বিশাল এক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার আন্তর্জাকিক মহলে অর্থনৈতিক ক্ষমতার জগতে প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। ভারতের এই দিনরাতের মধ্যে এইরকম বিশাল পদক্ষেপ নেওয়া তার চুরি করা ধনকে দেশের উন্নতির কাজে লাগানোর, এতে সমস্ত পৃথিবীতে ওলটপালট হবে। ভারতবর্ষকে লুট করে গরীব অনাহারে না খেয়ে মরিয়ে রাখার জন্যে যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলেছে ১৭৫৭ সাল থেকে, সেই সংস্থানকে উল্টানোর প্রথম পদ নিলেন আপনি। এতে আপনি হুশিয়ার থাকুন। ইরানের মুহম্মদ মোসাদেঘও সে পথে এগিয়েছিলেন, তারপর ওনাকে হাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আপনার দক্ষতায় আমার ভর্ষা আছে। আপনি কর্মযোগী। ফকীরি জগতে একটা কথা আছে, যে একবার মরে গেছে, তার মৃত্যুর কোন ভয় থাকে না, যে আগুনে একবার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সে ছাইকে পোড়ানো যায় না। আমি জানি আপনার শারীরিক মৃত্যুর ভয় নেই, কারণ আপনি ১২৫ কোটি দেবদেবীর পূজায় মগ্ন আছেন। লেগে থাকুন। ভারত মায়ের অঙ্গের ওপর এখন নফস জীহাদ হচ্ছে। আরও হোক। আমার তাঁর জীবনের প্রতি ভয় হচ্ছে কেননা ওনাকে কেউ উড়িয়ে দিলে আমি জানি না তাঁর মতন যোগ্য কেউ আছে কি না দেশকে এগুনোর জন্য। তাই আমার প্রার্থনা রইল এ নিয়ে।