মায়ের থাপ্পড়

আত্মনিবিষ্টতার চরম পর্যায় পৌঁছুলে এরকম ভাবনা মনে ঘুরঘুর করতে থাকে। প্রোগ্রাম ছিল এই উইকেন্ডে মায়ামি যাবার, অনেক স্কুলের বন্ধুদের সাথে পুরনো বন্ধনগুলি আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনবার। পুরনো বন্ধুদের সাথে মিলনের এক অন্য সুখ। বিশেষ করে জীবনের এই পর্যায়ে দেখতে পেলে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে, অনেক হাঁসি ঠাট্টা করা যায়, ইত্যাদি। সবই ভালো, তবে যখন টিকিট কিনেছিলাম, তখন খেয়াল হয়নি যে যে উইকেন্ডে যাবার আয়োজন করছি, সেইটি এবারের দুর্গা পূজার সপ্তমী অষ্টমী।

বিদেশে দুর্গা পূজোটা আজ অবদি ঠিক কিভাবে দেখা উচিত, সেটা এখনও নিজের মধ্যে সমাধান করে উঠতে পারিনি, আর বাকি পরিবারও তা করেনি। মানে দেশের মধ্যে থাকাকালীনও আমাদের পরিবার যে সারাক্ষণ কলকাতায় থাকত, তা নয়। আমার দাদু নিজে কটকে বড় হয়েছে। তখনকার দিনের প্রবাসী পরিবারদের টেম্পলেট ছিল ভারতের বা যেকোনো জায়গাতে থাকো না কেন, ওই বিয়েবাড়ি, পূজা, পইতে, এইরকম ফাঙ্কসানে লোক নিজের শিকড়ে ফেরত যেত, যা আমাদের ক্ষেত্রে ছিল উত্তরপাড়া। সেখান থেকে তারপর আমার মায়ের জেনরেশনে আমরা আমেরিকায়ে এসেছি। এখন আমেরিকার মধ্যে আবার আমি বড় হয়ে মাদের বাড়ির থেকে অন্যান্য জায়গায় চাকড়ি পড়াশুনা ইত্যাদির জন্যে থাকি। তা এখন শিকড়ে গিয়ে পূজা কাটানো মানে কি যেখানে মায়েরা আমেরিকায় থাকে, সেখানে যাওয়া? নাকি প্রত্যেক বছর নিজের উদ্যোগে এই এক-দু সপ্তাহ ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসল পূজোয়ে যাওয়া? মানে পরিবারের সাথে পূজা কাটানোর সাথে সাথে সে তখনকার প্রবাসে থাকা বাঙালির কাছে শিকড়ে ফেরত যাবার কিন্তু অনেক বেশী আকর্ষণ ছিল। সে পূজোয়ে ঢাকি থাকত, কেবল টেপ বাজত না। সে পূজোয়ে সমস্ত শ্রেণী নিয়ে গোটা সমাজ থাকত, যাতে আমার মনে হয় এতেও এক অজানা সুখ আছে, কেবলমাত্র বিশাল গয়নাগাটি পড়া দামি সাড়ি পাঞ্জাবি পড়া আর ফায়ার অ্যালার্মের জন্যে ধুনুচি না করা, মানে এই দুর্গা পূজা আর সেই দূর্গা পূজার অনেক বাস্তব এবং আধ্যাত্মিক তফাৎ আছে। তাছাড়া এখানে নভেম্বর মাসে কিন্তু বেশ এক টানা প্রায় ১ সপ্তাহর ছুটি পাওয়া যায় থ্যাঙ্কসগিভিঙ্গের, যখন থেকে অফিসে সবার বেশ ক্রিসমাসের মোচ্ছব লেগে যায়। সেই সময়টা থাকতে কি আর পূজার সময় ছুটি নেওয়াটা মানায়? আর নিলেও সে আমেরিকার মধ্যেই আরেকটা ঘুমন্ত পূজোয়ে গিয়ে হাজির হতে? কে জানি।

 

161006125155-live-stream-hurricane-matthew-bahamas-large-169

তাও বোধয় এত কিছুর মধ্যে হয়ত সেই দূর্গা পূজার উইকেন্ডেই অন্য জায়গায় যাওয়াটাও ভুল। তাই মনে হচ্ছে এই ঘুর্নিঝড় যেটা আমাদের সমস্ত প্রোগ্রামকে উড়িয়ে দিল, এইটা মায়ের থাপ্পড়। তাই এখন আর যখন কোথাউই যাচ্ছি না, নাই বা কলকাতায়, না বা মাদের পূজায়, নাই বা বন্ধুদের সাথে মায়ামিতে দেখা, ভাবছি কি করা যায় আগামী আর পরশু। কাজের চাপ এমনিতে অতুলনীয়। খানিকটা মনে রেহাই পেয়েছি এই উইকেন্ডটা ফাঁকা হয়ে গিয়ে, কেননা কাজে তাহলে এগুতে পারব। তবে এখানকার লোকাল পূজায়ে কিছু করা তো উচিত, মা যখন থাপ্পড় মেরেইছে। আবার এখানকার লোকাল পূজা নিয়েও একই আশঙ্কাবোধ করি কিন্তু। সেই একগাদা পয়শা ঢালব সারাদিন মুখ চুন করে বসে থাকার জন্যে। নাই বা কারুকে চিনব, নাই বা তেমন ইচ্ছে আছে চেনার। আগে এই ওয়াশিংটন ডিসিতে একা গিয়ে মুখ চুন করে বসেছি গত ২ বছর। এবার বউ বাচ্চা নিয়ে যাব মুখ চুন করতে আর সারাক্ষণ নিজের ফোন দেখতে? কমিউনিটি আয়োজিত পূজাগুলো ছাড়া আবার এখানে একটা কালীবাড়ি আছে, যেখানে বিনাপয়শায় পূজা দেখা যায়। মন্দিরটা আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এমনি সপ্তাহের মাঝে অবসর সময় পেলে ফাঁকা মন্দিরে গেছি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাথেও কিছু ধরনের সম্পর্ক আছে এদের। পূজাটি এখানে আমেরিকার তুলনায়ে সবচেয়ে ভালো করে। এমনিতে দুর্গা পূজার মন্ত্রপাঠে আমি কোনদিন মুগ্ধ হতাম না কলকাতার পূজাগুলোতেও। আমার আসল টান ছিল আরতির ঢাক আর ধুনুচির প্রতি। তবে এই কালীবাড়ির পুরুতের দূর্গা পূজার মন্ত্রপাঠ এক শোনবার জিনিশ। তাঁর ভক্তি শ্রদ্ধা এক অন্য স্তরের, মানে বোঝা যায় যে উনি কেবল গড়গড় করে পাঠ করার জন্যেই করছেন না। প্রত্যেকটি অক্ষর তিনি নিজে জানেন, এবং অন্তর থেকে সেগুলির মানে বুঝে তিনি গেয়ে গেয়ে সে মন্ত্র শ্লোক পড়েন। কিন্তু তাও সেরকম মন বসে না। দুর্গা প্রতিমার সাইজ সে বাড়ির সরস্বতী লক্ষ্মী পূজার সাইজের। গত বছর পড়ছিলাম কলকাতায় বিশাল উঁচু দুর্গা হয়েছে। কি তফাৎ। সোজা কথা বলি, আমার কাছে মায়ের চোখ থেকে এক অসাধারণ দর্শন শক্তি অনুভব করি, যেগুলো বিশাল এক ঘরের পেছন থেকে চোখ সরু করে দেখতে হলে তাহলে সে শক্তি অনুভব করা কঠিন। আমার ব্লগ পড়ে লোকজনের বিরক্তিকর লাগবে, মানে spoiled মনে হবে। সে যাই হই, এইগুলি আমার মনের কথা, আমার দরকার আর পছন্দ প্রকাশ করছি। আর কেবল এদিকওদিকের নিন্দে করছি না। হাথের মুঠোয়ে করনীয় জিনিশ থাকলে আমি তা করতে চাই। মানে আমার পছন্দের স্তরে পূজা দেখতে চাইলে তাহলে আমার এই ভক্তিপূর্ণ পুরুতের সাথে সাথে চাই খোলা প্যান্ডেলে পূজা, যেখানে বড় প্রতিমা বসানো যায়, যেখানে ফায়ার অ্যালার্মের কোন ব্যাপার থাকবে না আর ধুনুচির আয়োজন করা যাবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে হচ্ছে দেশ থেকে ঢাকিদের পুরদস্তুর এক দল যদি আসতে পারে, তাহলে তো ফার্স্ট ক্লাস। এই মন্দিরে ঢাক আছে একটা, কিন্তু ঠিক করে এরকম যন্ত্র কি আর আমাদের মতন ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার সফটওয়্যার ডিভেলপার ইত্যাদি পারি? তালজ্ঞান থাকলে ওই একটা বেসিক ড্যা-ড্যাঙ ড্যাঙ তাও হয়ে যায়, কিন্তু সে ভালো করে ঢাক কি বাজবে? এখানকার কমিউনিটি আয়োজিত পূজাগুলিতে মোটমাট কথা প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০-৪০ ডলার করে নেয় পাঁঠার মাংস খাওয়াতে আর কলকাতা থেকে কোন বড় শিল্পী এলে তো ৮০-৯০ ডলার নেয়। আমারই দুর্ভাগ্য, যে ৮০-৯০ ডলার যদি আমি খরচই করব, তাহলে আমি বাব্লু মাজির ঢাক শুনব, চন্দ্রবিন্দু নয়। আবার কালীবাড়িটা এখানে নিরামিশ কোন কারনে, ঠিক জানি না কেন। হয়ত বিনাপয়শায় ওদের পূজা হয় বলে।

চন্দ্রবিন্দুর জায়গায় বাব্লু মাজি? দাদা আপনি কমিউনিস্ট নাকি? না গো, আমি দুর্গা পূজাটা চাই এক দুর্গা পূজা হতে, আপনার ফালতু রক ব্যান্ড ফিউশন শোনবার জায়গা নয়। সেই, আমার কাছে উপায় খুবই কম। একদম খাঁটি পূজা আয়োজন করতে হলে তাহলে আমাকে বিশাল বড়লোক হতে হবে, যে বছরে একাই ৫০,০০০ ডলার খরচ করে আমি নিজেই সমস্ত কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা বানিয়ে আনব, নিজেই  সমস্ত ঢাকিদের আনব, নিজেই খোলা জায়গা জোগাড় করব, এইসব। সেরকম পয়শা খরচ না করতে পারলে তাহলে অন্য বিকল্প হচ্ছে অন্তত ওই সময়টাতে নিজে কলকাতায় যাবার ছুটি বের করে নিতে হবে।

তাও মনে হয় দুর্গা পূজা পছন্দের মতন না পেলে একদম পূজাকে বয়কট মারলে মা থাপ্পড়ের আয়োজন করে দেয়। তো দেখি কি করি। মুখ চুন করে আরেকটা পূজা কাটাতে হবে মনে হচ্ছে।

Advertisements

সহজ গান

কয়েক বছর আগে আমি একজন ব্যক্তির কাজের সাথে পরিচিত হই youtube জগতে। সৌমিক দে নামের ভদ্রলোক। তিনি মাঝে মধ্যে পশ্চিম বাঙলার নানা গ্রামগঞ্জে বাউল সঙ্ঘগুলির ভালো  উচ্চশ্রেণীর ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড করেন। এই রেকর্ডিংগুলিতে তিনি একেবারে ওইখানে বসে গান শোনার ভাবটি আনতে পারেন, যা আমি আমার এত বছরের youtube চর্চায় আর কারুকে এত ভাল করে করতে পাইনি আজ অবদি। সৌমিকের কারনে আমি “মনের মানুষ” সিনেমা বেরুনোর বছর দুএক আগের থেকে গরভাঙ্গা গ্রামের বাউলগুষ্টির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। আমি যখন সিনেমাটি দেখি তখন আশ্চর্যে ভাবি, এদের তো দেখেছি অনেক বেশী ব্যক্তিগতভাবে। তখন আমি দূর্গা পুজোর কিছুদিন বাদে অ্যামেরিকা থেকে ১ মাসের ছুটি নিয়ে গেছিলাম। ৪ দিন বহু কাকুতিমিনতি করে পরিবারের কাছ থেকে রওনা দিয়ে গিয়ে থেকেছিলাম ওই গরভাঙ্গা গ্রামের আশ্রমে। তখন কোন ফাঙ্কশান-টাঙ্কশান ছিল না। যেমন বাউলের ঘরের গান সৌমিক ইন্টারনেট জগতে উঠিয়ে দেয়, ঠিক সেই অভিজ্ঞতা আমার সামনাসামনি হয়েছিল।

সেখান থেকে আসার পর থেকে খুব জায়গাটাকে মনে করি, যেন সেইদিনই ছিলাম সেখানে। আসার পর থেকে সেই youtube থেকেই যা পাচ্ছি। সৌমিক আজকাল নিজেও ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে দারুণ সঙ্গত দিচ্ছে বাউল শিল্পীদের ওনার আজকালকার রেকর্ডিংগুলোতে।

কিছুদিন আগে একটা নতুন পোস্ট হয়েছে, হাফিজ মাসুম নামের একজন বাউল শিল্পী পাশের বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন মুর্শিদাবাদে। আমেরিকার চলিত ভাষায় লোকটার একটি গুণ আছে, যাকে বলা হয় swag বা swagger। swag জিনিশটা মানুষের নিজের থেকেই থাকে, এইটা চেষ্টা করে আনানো যায় না। মূলতভাবে বলতে গেলে ব্যক্তির অন্তর থেকে এক আকর্ষণিয় প্রতিভা অনুভব করতে পারলে তাকে বলা যায় তার swag আছে। কথাটি এমনিতে র‍্যাপ সঙ্গীতের জগতে অনেক ব্যবহার করা হয়, আর মাঝে মধ্যে পুরনো আফ্রিকান-আমেরিকান সঙ্গীতেও দেখেছি ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এ গুণের বেশী প্রচলন অন্তত স্পষ্টভাবে নেই বলে যখন আমি খুঁজে পাই, তখন বেশ মজার লাগে। শিল্পীকে দেখা যায় কিরকম অপুর্ব তালজ্ঞান আছে, তার সাথে গানের মাঝে থেমে থেমে তত্বজ্ঞান ছাড়ছেন। আর বেশ আনন্দে মেতে আছেন, হেঁসে হেঁসে গাইছেন। আর আরেকটা জিনিশ যেটা আমার ভালো লাগল এনার গানে হচ্ছে যে ইনি নিজের গলার আওয়াজ কতটা সুরে থাকতে পারল, তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। যথাযথভাবে যখন নিজের গাইবার দরকার পড়ে না, তখন নিজে থেমে ব্যাকগ্রাউন্ড গায়কদের দিয়ে তিনি লাইনটা শেষ করিয়ে নেন, আর নিজে জিরিয়ে নেন পরের তত্ব দান করার জন্যে।

গানটা মন দিয়ে শুনলে  কিরকম লোকটি আপনার ভাবকে উঁচিয়ে দিতে পারে, আর মাশেকপুর কোথায় বা সেখানকার বাবাজান কেমন লোক, তা জানার দরকার পড়ে না। অন্তত আমার হৃদয়ের মধ্যে একটা ধড়প ধড়প মতন মনে হয় গানগুলো যখন শেষ হওয়ার দিকে এগোয়ে। যেন মনকে এক মাত্রা থেকে আরেক মাত্রা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেল ওই ৪-৫ মিনিটে।

আরেকটিও বেরিয়েছে হাফিজ মাসুমের, যদিও এইটা কেবল অডিওই। এতেও অনেক থেমে থেমে গান গাওয়া আছে, আর ওপরের ভিডিও দেখলে কল্পনা করাই যায় কেমন উত্তেজনা বা তাপের সাথে শিল্পী এই তত্বগুলি দিচ্ছেন একটার পর একটা।

এইরকম সঙ্গীত পরিবেষণের প্রতি আমার ব্যক্তিগত আকর্ষণ বোধহয় জমিয়েকার রেগে সঙ্গীত থেকে আসে। রেগে সঙ্গীতে আবার বোধহয় ভারতীয় উপমহাদেশের পুর্ব প্রান্তের ছাপ থাকতেও পারে। রেগে সঙ্গীতের প্রধান আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা হচ্ছে রাস্তাফারাই নামের এক সম্প্রদায় যাতে ভারতের ১৮০০ শতাব্দীর অভিবাসীরা যারা ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে গেছিল, তারা সেখানকার ধর্ম ও সংস্কৃতি ছুঁয়ে গেছিল। রাস্তাফারাইরা সাধুফকীরদের মতন জট রাখেন, গাঁজাকে পবিত্রভাবে মানেন, অনেকে আবার মাছ মাংস ত্যাগ করে। আরও কিছু আমি রাস্তাফারিয়ান রেগে গানের মধ্যে শুনেছি কিছু সনাতনী তত্ব যেমন পয়শা ধার নিলে মানুষের আত্মা ছটফট করে। একটা নতুন ডকুমেন্টারি বেরিয়েছে “ড্রেডলক স্টোরি”, এখনও দেখিনি কিন্তু এইগুলো নিয়ে অনেক চর্চা কেউ কেউ করেছে:

http://indiaempire.com/article/614/practices_of_indian_sadhus_are_seen_in_the_rasta_way_of_life

এইরকমের রেগে সঙ্গীতে আমি অভ্যস্ত ক্যারিবিয়ানের এত কাছে থেকে। এদের পোশাক থেকে ভাব এবং মনের দরদ অনেকটা বাউলের সাথে মিল আছে যদিও ওপর থেকে দেখলে বোঝা যায় না।

কোথায় ছিলে তুমি এতদিন

মনের যতরকমের পরিস্থিতি হয়, সে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমি মনে করি বিভিন্ন ধরনের গান সুর ও তাল তার সহযোগিতা দিতে পারে। ছড়াগান বা ছন্দমূলক কবিতা আবৃত্তি যদিও এক পুরাতন ও বিশ্বজনীন সংস্কৃতি, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি বড় শহর থেকে ৯০ দশকে এর বিদ্রোহী কাব্য রূপে একটি ধারা সৃষ্টি হয়, যার নাম র‍্যাপ। র‍্যাপ অন্যান্য শিল্প আকৃতির মতনই সে রুপকারকে তার মনের অনুভূতি প্রকাশ করার এক মঞ্চ দেয়। র‍্যাপ করার জন্যে কেবল একজনের মগজ দরকার, কোন যন্ত্রপাতির দরকার পড়ে না। বড় জোর একটা টেবিলে তাল বাজানো যায়। যেহেতু এ রীতি এত সহজ (ওপর থেকে), আমার মনে হয় এতে শিল্পী অনেক বেশী তেজ আনতে পারে তার ভাবপ্রকাশে, অনেক বেশী সত্যতা থাকে তার নৈরাশা ও আনন্দে, তার ব্যাঙ্গ ও সোজা কথাতে।

বড় হওয়া কালীন হাথের মুঠোয় আমেরিকায়ে তৈরি ইংরেজি ভাষায় র‍্যাপ সঙ্গীত তো ছিলই, মায়ামিতে থাকার ফলে আমি এটাও দেখতে পাচ্ছিলাম যে আমেরিকাতে বসবাস করা অন্যান্য দেশ থেকে আসা (বেশীরভাগ ল্যাটিন আমেরিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ) সমাজেরা কিভাবে এ র‍্যাপ ও হিপহপ জগতের সাথে মিলেমিশে তারা নিজেদেরও সঙ্গীত পরম্পরাতে এ নতুন সক্রিয়তা আনছিল। যে কোন শিল্প আকৃতির ক্ষেত্রে, যখন এক জাত থেকে আরেক জাতে সেইটি আশ্লেষ হয়, তখন কোন শিল্পী সেটাকে ভালো করে করতে পারে, আবার অনেকে বোকা বোকা শোনায়। সময় এবং নৈকট্যের সাথে সাথে সক্ষম উদাহরণগুলি বাড়তে থাকে, আর বাজেগুলো আড়ালে চলে যায়। ব্যাপারটা হচ্ছে সে নতুন শিল্প আকৃতির মূল ভাবটা ঠিক করে চেনা ও বোঝা, এবং তারপরে নিজের বাস্তব জগতে নিজের ভাষায় অন্তরীণ করা।

যেমন কিছুদিন আজকাল বাঙলা ভাষায় কাওয়ালী গান হচ্ছে।

এইটা এক খুবই স্বাভাবিক ক্রমবৃদ্ধি বাঙলা লোকগীতির জগতে। ভোউগলিকভাবে পাশেই আছে বিহার এবং বাকি উর্দুভাষী এলাকা, সুতরাং এ সঙ্গীতগোত্র যে এতদিন কেবল উর্দুভাষী আর পাঞ্জাবিভাষী হিসেবে পরিচিত ছিল, সেইটি কোন না কোনদিন তো বাঙলাতে আসতই। কিন্তু একেবারে সোজা কপি মারেনি কিন্তু বাঙলার বাউল শিল্পী, বাউল সংগিতধারার ছাপ একদম স্পষ্ট।

সেভাবে আমাদের রবীন্দ্রসঙ্গীতে বিলেতি শাসনের ফলে সে ইউরোপীয় গানের ছাপ আছে। তারপরের বাঙলা আধুনিক যে গান হয়েছিল ওই ৭০ দশকে, ওইগুলো শুনলে বোঝা যায় যে খুবই আমেরিকা-মুখি হয়ে দাঁড়িয়েছিল শিল্পীরা নতুন চিন্তা ও প্রেরণার জন্যে। আজকের ইন্টারনেটের যুগে আরও সহজ হয়ে গেছে এক রীতির মূল চর্চা করার, বিশাল ভৌগলিক দূরত্ব থাকা সত্বেও। আর বাঙালি নতুন প্রজন্ম খড়খড়ে মেটালের পাগলামিতে আটকে নেই (যদিও এখনও দুঃখের কথা এরা সবাই বাংলাদেশ থেকে, একজনও কেউ আমার পশ্চিমবাংলার নয়)।

আমার কিছু প্রিয় বাঙলা ভাষায় র‍্যাপারদের এ ব্লগমঞ্চে উপস্থাপন করি। প্রথম হচ্ছে নিজাম রব্বী। সাংঘাতিক বাঙলা ভাষা কাব্যের সাধক। এই “অন্ধকার” কবিতার ভাব কেমন যেন আমাকে আঁকড়ে ধরতে পারে। অন্তরের একদম গাঢ় এলাকার সাথে যেন দেখাসাক্ষাত মেলামেশা করছেন কবি। যেটা আমার কাছে বিশেষ করে আকর্ষণিয় এ নিয়ে হচ্ছে যে নিজ মাতৃভাষায় এখন সে মনোভাবের সাথে আলোচনা করা যাচ্ছে, যা হয়ত আগের প্রজন্মের সাহিত্যে শ্রেণিভেদের কারনে সেখানগুলো পৌঁছনো যেত না, বা খুবই কৌশলীভাবে পাওয়া যেত…তাকে স্ফুট করা হয়েছে, আর এতেও এক সৌন্দর্য আছে। ভিডিও আর কথা নিচে দিচ্ছি

“কেন আমি এই মৃত্যু স্তূপে? হঠাত করে করে হামলা কারা হিংস্র রূপে রাত দুপুরে? অন্ধকারে করে নাড়াচাড়া, বন্ধ আমি ধ্বংস পুরে! খেয়ে যায় কার দেখ মাংস পুরে, অন্ধ সেজে ভন্ড পরী বদলে যায় সাথে সাথে এক ভয়াবহ পেতনি maybe, I’m stuck! নিজের ছায়া দেখে আঁতকে উঠি এই এই কে ওখানে? মস্তিষ্কে এক ধাক্কা ভারি, আরে…কেন জানি হঠাত ঝাপসা লাগে চোখে। ঘড়ির কাটায়ে ঝুলছে মাথা, দুলছে দোলনা কিন্তু কোন মানুষ ছাড়া। এত বেশী কাল ধোঁয়া এত বেশী অত্যাচার! চার পাশে ভেসে যায় যেন রক্ত স্রোতে! কেন? গিলে নেয় আমায়ে, টেনে ছিঁড়ে দেয় কোন এক আজব শক্তি লক্ষ্মী সাজে, ভক্তি না এসে উপচে বমি আসে! ছয় ছয় ছয় বলে মূর্তি হাসতে থাকে আঃ! সহ্য হচ্ছে না আর আমার, মৃত্যু তাকেই দরকার! যেন বেঁচে থাকা মানে torture! কেন? আমাকেই শুধু দরকার…মুক্তির স্বাদ খুঁজে বেড়াই, ধারালো ছুড়িটা চালাই গলায়ে…আত্মার সাথে যুদ্ধ শুরু! এই দেখি এইবার কে কাকে হারায়ে!”

ওপরেরটা কেবল একটি উদাহরণ ছিল এই বিদ্রোহীকাব্য আবৃত্তির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ র‍্যাপ শিল্প আকৃতির। র‍্যাপের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে ফ্রিস্টাইল। এটিও আমরা বাঙলার পুরাতন সংস্কৃতিতে পাব কবির লড়াইয়ের রূপে। দেখি কিভাবে রাস্তায় রাস্তায় এ র‍্যাপগান আমাদের বাঙলা ভাষাকে নতুন অন্বেষণে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিভা ও পরিশ্রম না হলে এরকম হালকা মজা করা যায় না।

অবশ্যই এরকম এক যন্ত্রের ব্যবহার রাজনৈতিক ব্যাপারে যোগদান করা স্বাভাবিক। হীরক রাজার দেশের বাউল শিল্পী যেমন রাজার দরবারে এসে রাজাকে শুনিয়ে গেছিল কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, তেমনি এই র‍্যাপগানে সেরকম কথা জড়ানো হচ্ছে বাঙলা ভাষায়। এতে আমার মতে সবচেয়ে দক্ষ হচ্ছেন তৌফিক।

যাক অনেক ভিডিও দিলাম এবার। আরেকজনদের নাম উল্লেখ করব, জ্বালালি সেট। এদের নতুন অ্যালবাম বেরিয়েছে, বনবাসের সাধন নামের। ওদের সেদিন ইন্টার্ভিউ দেখছিলাম, বহুত পরিশ্রম করেছে এ কাজের জন্যে, আর প্রচুর মেধাবী ছেলেগুলো। অনেক ওখানকার আঞ্চলিক বাঙলা ভাষার ব্যবহার করে বলে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় আমার, কিন্তু এতেও আমি এক আনন্দ পাই কেননা শিল্পী নিজের অন্তরের কথা বাড়ির ভাষায় বললে একটা সাধুতা অনুভব করা যায়। বেশ কিছুবার মন দিয়ে শুনতে হয় এ ক্ষেত্রে। আর র‍্যাপগান কিন্তু মন দিয়ে শোনারই বস্তু। প্রত্যেকটি কথার মূল্য আছে কেননা এখানে কথাই সমস্ত। “Mood setting” এর সঙ্গীতধারা নয়।

আর আমারে মারিস নে

যে পরিমাণে মানুষ কচুকাটা হচ্ছে আজকাল, মানুষ জীবনের মূল্য একেবারে ডুব দিয়েছে মনে হয়। মাঝে মধ্যে ভাবি এর মূল কারণ বোধয় মানুষের জনসংখ্যা সত্যিই বেশী অতিরিক্ত হয়ে গেছে। এই ভেদাবেদের বৈষম্য চিরকাল ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় মানুষের সংখ্যা যত আকাশ ছোঁয়ান পর্যায়ে পৌঁছুবে, তত বেশী এই হিংসাত্বক কান্ডকারখানাও বাড়বে। কেননা এখন ২০০ লোক মরা মানে আগেকার দিনে ৫জন মারার সমান। এর মধ্যেও এক শ্রেণী হিসেবে অসাম্য বিশেষ করে সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়ছে। এ অসাম্যের পেছনে ব্যাক্তিগত স্বার্থের ব্যাপার আছে, আর আবার আছে আমাদের বাস্তব সংবাদ জগত এবং তাদের কোনদিকে হেলান পড়ে। আমি অস্বীকার করব না এ কথাটি। বাংলাদেশে পুরোহিত হত্যা বা শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো আমাকে মনের এমন এক জায়গায় আঘাত করে একজন বাঙালি এবং হিন্দু হয়ে যেটাতে ইরাকের সুইসাইড বম্বিঙ্গে ২০০জন আহত হলে আমার কাছে সেইটা কম পর্যায়ে আঘাত আনে (“আরশোলার মতন পিলপিল করে জন্মা আর ওরকম করে মর”)। একই ভাবে যখন ১৯ বছর বয়সের তরুণ ভারতীয় উৎসের আমার মতন আন্তর্জাতিক নাগরিক খুন হয়, সেটার দাম সৌদির মারামারিতে মানুষ মরার চেয়ে মূল্য বেশী। আমি ফেসবুকে অনেককেরই দেখি তাদের মতগুলি, যে প্যারিসে ২০জন মারা গেল আর বেইরুটে ২০০, কিন্তু “প্রে ফর প্যারিস”এর হুজুকেই কেন লোক মেতে ওঠে, আর বেইরুটের মানুষ কি মানুষ নয়? আমার মনে হয় মানুষ সবাই, কিন্তু এ কথাটি এক দূরের আদর্শ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আজকাল। আর যত এসব খুনখারাবি চলতে থাকবে, তত বেশী আমরা আমাদের আদিম ভাবধারার ছিদ্রে পড়ব, কোন উপায় নেই।

নিশ্চিত করনীয় কিছু নেই। নিজে চেষ্টা করব যেচেয়ে ভিড়ওলা জায়গায় না যেতে। সুক্কুরবার রাতে যদি সিনেমা হলে সিনেমা দেখা আর বাড়িতে বসে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখার সামনে দুটি বিকল্প থাকে, তখন বাড়ি থেকে বেরুনোর বিপক্ষের যুক্তিদের মধ্যে (বাড়ি থেকে বেরুনো, সিনেমার টিকিটের দাম, বাড়ির আরাম ত্যাগ করা) এটাও পেছনে পেছনে বা সামনাসামনিই থাকবে, যে কোন দিশেহারা পাগল যদি আটোম্যাটিক বন্দুক নিয়ে মানুষকে খুন করতে বেরোয়ে সেই সিনেমা হলে, তাহলে তার থেকে আমরা বাড়িতে থাকলে বাঁচব। এমনিতে আমি এসব বিশাল মেন্সট্রিম পপ জগতের কালাকারদের ভক্ত নই। ২০০ ডলার দিয়ে দূর থেকে বিয়ন্সেকে দেখা বা সুপার্বোল দেখার চেয়ে আমি ওই ২০০ ডলারটি দেশের গরীব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে বেশী আনন্দ এমনিতেই পাই, আর বোমাবাজির জগতে এসব মানবগুষ্টির মহামিলনকেন্দ্রে গেলে প্রাণ যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আরেকটা কথাও আজকাল মনের মধ্যে ঘুরপাক করছে, দুএকটা কোরানের আয়াত মুখস্ত করলে ক্ষতি নেই, বিশেষ করে সেই মুহূর্তে জীবন ও মরণ যদি এর জানার ওপর নির্ভর করে।

আশা রাখলাম জীবনটা নির্ভয় কাটানোর মতন আত্মবিশ্বাস কোনদিন যেন না হারাই। আর এত আঘাত খেতে খেতে অমুসলমানদের মধ্যে (বিশেষ করে ভারতীয়) ইস্লাম-বিদ্বেষীকতা বাড়বেই। আদর্শ হিসেবে আমি বরাবরই রাখব যে এ ঘৃণাত্মক মনোভাব কখনও ব্যাক্তিগত আচরণের ওপর প্রভাব না ছড়ায়ে।

 

অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১

শনিবার দিন দুপুর বেলা হচ্ছে সপ্তাহের সবচেয়ে কার্যরত সময় একটি, কিছু ধরনের মজা করার। আমাদের এই ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায়ে সাধারণত অনেক কিছু দেখার বা করার মতন থাকে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিউজিয়ামগুষ্টি এখানে আছে, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম। তা ছাড়া অনেক সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আছে আশেপাশে, জঙ্গল, পাহাড়, ঝরনা, পুরনো দুর্গ, ইত্যাদি। আর নাটক, নানা ধরনের সঙ্গীত উৎসব, সিনেমা উৎসব, খাদ্য উৎসব, কোথাও না কোথাও চলতেই থাকে। তবে শনিবার দিনগুলো যখন স্যাঁতস্যাঁতে মেঘলা আকাশে ঢাকা থাকে, তখন আর কি করব? বাড়ি বসে খিচুড়ি খাওয়া আর নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবে সিনেমা দেখা ছাড়া আর উপায় নেই।

এবারের মেঘেঢাকা শনিবার দুপুরকে আমি পরাজিত করলাম। বাড়িতে ডাকা হল দুজন বন্ধুদেরকে। বের হল আমার সবচেয়ে প্রিয় বোর্ড গেম,  অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১। প্রথমবার বা নতুন খেলোয়াড়দের সাথে খেলতে গেলে খেলাটা লেগে যায় বেশ ৭-৮ ঘন্টাখানেক। এ খেলায় দরকার দাবার চেয়েও বেশী কৌশল, আর পাশার চেয়েও বেশী চট করে মনের মধ্যে সম্ভাবনার অঙ্ক কষা, আর খানিকটা অবশ্যই ভাগ্যের সহযোগিতা। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের খেলতে সময় লাগে মাত্র আড়াই ঘন্টা, আর সে বিলাসিতা আমাদের সকলের মধ্যে এবার ছিল। সাথে সাথে বাচ্চাকে খাওয়ানো ঘুমপাড়ানোতে পুরো খেলা খেলতে লাগল ৪ ঘন্টা এবার। মন্দ নয়। আর বেশ জমেছিল। প্রত্যেকটা ছক্কার চালের আগে সবার মধ্যে যেন একটা বুকের মধ্যে হাঙ্গামা হচ্ছিল, আর চালের পর জোর আওয়াজে দীর্ঘশ্বাস, একদলের বেদনা, অন্যদের আনন্দ, ঠাট্টা।

খেলাটির প্রসঙ্গ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে। ২টো দলের খেলা, অ্যাক্সিস এবং অ্যালাইজ। অ্যাক্সিসে আছে জার্মানি ও জাপান, অ্যালাইজে আছে রাশিয়া, বিলেত ও অ্যামেরিকা। ৫জন খেলোয়াড় থাকলে একজন একেকটা দেশ নিয়ে খেলতে পারে, বা ২জন থাকলে একজন গোটা অ্যাক্সিস আর অন্য ব্যাক্তি গোটা অ্যালাইজ হয়ে খেলতে পারে। ৩ বা ৪ থাকলে নিজেদের অনুযায়ী নিজেদেরকে ওই দুটি দলে বিভক্ত করে নিতে পারে।

Axis & Allies 1941 is Setup and Ready to Play

এ খেলায়ে বহুত নিয়ম আছে। মূল নিয়ম হচ্ছে একজন দেশের পালার সময় প্রথমে তাকে তার পয়শা দিয়ে নানান ধরনের সামরিক বিনিয়োগ করতে হবে, যেমন ট্যাঙ্ক না ফাইটারপ্লেন না জাহাজ কিনব। দ্বিতীয় হচ্ছে যুদ্ধ করা, যেটা ছক্কাগুলো দিয়ে হয়। তৃতীয় হচ্ছে যুদ্ধহীন চাল খেলা, যেমন কোন নিজের দখলের জায়গাতে নতুন সৈন্য এনে সেখানটাকে আরও মজবুত করা। আর অন্তম হচ্ছে প্রথম পর্যায়ে নতুন কেনা ঘুঁটিগুল নিজের যেখানযেখানে কারখানা আছে, সেখানে বসানো। খুঁটিনাটি নিয়মগুলো হচ্ছে জানা যে কোন চালগুলোকে যুদ্ধের চাল হিসেবে ধরা হয়, কোনগুলো ধরা হয় না, জানা যে একটা ঘুঁটি একবার যুদ্ধ করে থাকলে সে ঘুঁটি ওই পালায়ে আবার যুদ্ধ করতে পারবে না (এরও আবার ব্যাতিক্রম আছে), ইত্যাদি। এ কারনে প্রথম দুএকবার খেলবার পর যখন সমস্ত খেলোয়াড়েরা নিয়মগুলোতে পাকা হয়ে যায়, তখন সত্যিকারের খেলাটা জমে ওঠে। ওই প্রথম দুএকবার অনেক সময় কেটে যায় তর্কবিতর্কে, নিয়মের বইটা ঘেঁটে দেখা, ইন্টারনেটে ফোরাম পড়া।

আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ খেলার জন্যে হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইদানীং রাশিয়া। আমার মতে সবচেয়ে কঠিন এদের প্রারম্ভিক অবস্থান। সবচেয়ে কম টাকা, এবং জার্মানি একদম ঘাড়ের ওপরে। রাশিয়া হয়ে যেই খেলবে, তার উচিত যাহোক করে টিকে থাকা। একটা ট্যাঙ্ক আর একটা সৈন্যর চেয়ে ৩জন সৈন্য প্রতিরক্ষার জন্যে আমার মতে বেশী কার্যকর (দুয়েরই একই দাম পড়ে)। তারপর সবচেয়ে প্রিয় দেশ খেলার জন্যে হচ্ছে জাপান। এদের হয়ে খেলা সোভিয়েতের মত কঠিন না হলেও শক্ত আছে। নানান দিকে নিজেদের রাজত্বকে সম্প্রসারিত করতে হবে যদি চট করে অ্যামেরিকার আর্থিক ক্ষমতাকে দমন করতে হয়। তা না করলে অ্যামেরিকা শেষের দিকে খুব সহজে জাপানকে পরাভূত করে দেবে। তার সাথে জাপানের সাথে ছিল আমাদের নেতাজী, তাই জাপান হয়ে খেললে ভারত থেকে ইংরেজদের পরাজিত করতে পারলে আমি বাস্তবে একটু সুখ পাই, যে আজাদ হিন্দ ফওজ এ যুদ্ধে উপস্থিত ছিল। খেলার সাথে সাথে খেলার একটা গল্প রচিত হয়ে যায় প্রত্যেকবার। জাপানের পর বলব সবচেয়ে ভালো লাগে অ্যামেরিকা হয়ে খেললে। এদের বলা যায় সবচেয়ে সহজ অবস্থান, এবং দুএকটা কৌশলগত ভুলও করা যায় অ্যামেরিকা হয়ে, কেননা টাকার অভাব নেই, আর সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেশ দূরে সরানো। জার্মানি ও বিলেত দুটোই কঠিন আর খেলতে গিয়ে আমার ব্যাক্তিগতভাবে সবচেয়ে কম মজা পাই। তাও কেবল দুজন খেলোয়াড় হলে সমস্ত দুটি বা তিনটি দেশ হয়েই খেলতে হয়।

গত শনিবার আমার বউ আর তার এক বান্ধবী আমাকে আর আমার বন্ধুকে খুব সংকীর্ণভাবে হারালো। আমরা ছিলাম অ্যালাইজ। আমার বন্ধুর হাথের চাল এতই খারাপ, ওর কিছু কিছু যুদ্ধে ও ৩-৪টে ট্যাঙ্ক হারাতো দুজন সৈন্যর বিরুদ্ধে (একেকজন সৈন্য মারে ১ পড়লে, আর একেকটা ট্যাঙ্ক মারে ৩, ২ ও ১ পড়লে)। যাতা একদম। খেলার পরে বেশ কিছুদিন ধরে টেক্সট মেসেজে আমাদের বিশ্লেষণ চলেছে। রিম্যাচ তো হবেই হবে। তাও সত্যি বলতে গেলে এ পরাজয়ে একটু আনন্দ পাচ্ছি আজকাল। বউও এখন ভালো করে খেলাটা শিখে গেছে, আর মাঝে মধ্যেই ঠাট্টা করে আমাদের হারা নিয়ে। মজা কর এখন। হাম কাল তুমকো দেখলেঙ্গা 😀

পুনশ্চ: এ খেলার কয়েকটি সম্পাদনা আছে। আদি খেলাটি ১৯৮০ দশকে বেরিয়েছিল, যেইটি সত্যিকারের দিন-দুএক লাগে খেলতে। আর ওই খেলার নিয়মগুল আরও বেশী জটিল। এই “অ্যাক্সিস অ্যান্ড অ্যালাইজ ১৯৪১”টা একটি নতুন সংস্করণ, গত ৫ বছরে বেরিয়েছে, একটি সহজ ও পরিচায়ক খেলা হিসেবে।

ইংরেজি মেশানো কথিত বাঙলা এবং তার ফলাফল

আমেরিকাতে সাফল্যভাবে সমাজে অঙ্গীভূত হওয়া নিয়ে অনেক অভিবাসীর মনে নানাধরনের ধারণা থাকে। আমার ধারণা হচ্ছে যে সমস্ত নাগরিকেরই দুটি ছদ্মবেশ গড়া জরুরি। এক হচ্ছে প্রচলিত জগতের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে জুড়িয়ে নেওয়া, দ্বিতীয় হচ্ছে নিজের আন্তরিক একটি “ঘর” গড়ে তোলা, যে ঘরে আমিই একা রাজা/রাণী, যে ঘরে আমাকে কেউ টপকাতে পারবে না। এ ঘর সংস্থাপিত না করলে আমার মনে হয় সে ব্যাক্তির সম্পূর্ণ মনের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে, এবং এক ধরনের বিষাক্ত ভাব সে ব্যাক্তির মনে বিস্তারিত হয় যেইটি তার প্রচলিত (এক নম্বর) জগতেও প্রকাশ করতে পারে। বিপরীতে, অন্তরে নিজেকে গড়ে উঠলে বাইরে যতই অপমান বা অবিচার ভোগ কর না কেন, এক ধরনের মুচকি হাঁসি থাকবে মনের মধ্যে।

যে বাঙালি বাবামায়েরা নিজেদের বাচ্চাদের আমেরিকার সমাজে পালন করছে, এবং সে শিশুদের বয়স এখনও অল্প, তাদের কাছে আমার কিছু মতামত বলি। এ কথা বাঙালি-অবাঙালি মেশানো ঘরের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। বাঙলা ভাষায় সে শিশুকে এক্কেবারে বাকপটু করুন। সে বাচ্চা যতই আপনার মতে দেশের বাঙ্গালিয়ানার থেকে সরানো থাকুক না কেন (ওই তৃনমূল-সিপিমের মারামারি, বা বাংলাদেশিদের রাজাকার-আওয়ামির মারামারি, ওই ব্যাঙ্কে ঘুস না দিলে নিরুপায় হওয়া, ওই পলিউশনের ধোঁয়া, ইত্যাদি), সে বাচ্চা তার বাকি বাস্তব সমাজের কাছে কিন্তু একজন বাঙালিই। এর মানে নয় যে তার সেই বাস্তব সমাজ তাকে আমেরিকান হিসেবে মানে না। আমাদের আমেরিকান হওয়া মানেটা কি, সে ধারনা খুব ভালো করে বোঝা উচিত। আমেরিকান মানবে, তবে সমাজ তাকে নিজেদের সাদা বা কালো বা হিস্প্যানিক জাতিদের মধ্যে কোনদিন মানবে না, সে বাচ্চা আর্ধেক অবাঙালি অভারতীয় জাতির হলেও। এইটাই বাস্তব। এইটি হচ্ছে সে শিশুর অতিরিক্ত একটি বৈশিষ্ট্য। ক্লাস ১২ পর্যন্ত আমেরিকার বাচ্চারা একটি খুবই শ্রেণীবিভেদহীন জগতে চলাফেরা করবে, তাদের বাবামায়ের যতই শিক্ষা ও মাইনে হোক না কেন। এর নিন্দা আমি কোনদিনই করব না, কারন শ্রেণীহিসাবে ভিন্নভাবে বড় হওয়াটাও মানুষের পক্ষ্যে ক্ষতিকর (ভারত বা বাংলাদেশে যেমন স্বাভাবিক)। তবে আপনার ওয়াইট-কলার কর্পোরেট জগতে যে অশোধিত আচরণের থেকে আপনি মুক্তি পান, সে বিকল্প আপনার শিশু অন্তত ক্লাস ১২ অব্দি (অতএব ১৭-১৮ বছর বয়স) পাবে না।

সুতরাং এই বৈশিষ্ট্যটি গড়ে তোলা উচিত। সে যেন সোমান তালে বাঙলায়ে কথা বলতে পারে, বই পড়তে পারে, ডাইরিতে লিখতে পারে। এ বাঙলা ভাষা যেন তাকে তার নিজস্ব “জাতি”র সাথে মিশিয়ে দিতে পারে। দেশে গিয়ে হারিয়ে গেলে সে যেন পানের দোকানদারের কাছ থেকে রাস্তার সন্ধান পেতে পারে। এইগুলোতে সে এক আনন্দ ভোগ করবে। এ ভাষা না জানলে কিন্তু তার ভুবনে এক কঠিন পরিচয় সঙ্কট সৃষ্টি হবে। সে তার আমেরিকার-সমাজ-আনুসারিক-বরাদ্দ জাতির সাথে যদি ভিন্নবোধ করে, তাহলে সে আজীবন এইটি নিয়ে লড়াই করবে। বাড়ির চাপে সে হয়ত তার পড়াশুনা ঠিক মতন করে নেবে, কিন্তু বড় হয়ে তার এক জাত-ভিত্তি হীনমন্যতা গড়বে।

এ বিষয়ে কিছু গবেষণা করেছি, যে কিভাবে বাংলাভাষাটি বাচ্চা শিখবে আমেরিকায় বড় হয়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাড়িতে কেবল বাঙলায় কথা বলা। যদি স্ত্রী বা স্বামী অবাঙালি হন, তাহলে তার সাথে ইংরেজি চলবে, কিন্তু বাচ্চার সাথে কেবল বাঙলা। বাচ্চা ইংরেজিতে আপনার সাথে কথা বললে ভান করুন না বোঝার। এইগুলি আমেরিকার পিডিয়াট্রিসিয়ান জার্নালের চর্চা (আমেরিকাতে এখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চেষ্টা চলছে তাদের নতুন প্রজন্মদের বহুভাষী হিসেবে গড়ানোর, এগুলোতে মাথার মগজেরও উন্নতি আছে), আমার নয়। শনিবার রবিবার বাঙলা ক্লাস করা যায় এক-দেড় ঘন্টার, যে ক্লাসের নিজস্ব হোমওয়ার্ক হবে। অ-আ-ক-খ ১-২-৩-৪ থেকে শুরু করে, নিজেকে বাঙলা ভাষার বক্তা থেকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের কলকাতার উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইংরেজি-মিডিয়ামে পড়া কথিত বাঙলার যা ইংরেজি মেশানো খিচুড়ি অবস্থা, সেইটাকে চরম চেষ্টা করে ত্যাগ করতে হবে। সাধারন কথাবাত্তায় আমরা যে পরিমাণে ইংরেজি মেশাই, এতে এক বাচ্চার বাঙলা শেখা অসম্ভব। এক উদাহরন দি, “এই গুলু, লিভিং রুমের লাইটটা অফ করে দিয়ে আয় তো।” এ বাক্যে আছে living room, আছে light, আছে off। এই বাক্যটির বিষয়গুলো কিন্তু এমন বস্তু নয় যেগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি বা পরিভাষার সঙ্গে জড়িত (ধরুন কম্পিউটার, আইফোন, কুয়ান্টাম মেকানিক্স, ইত্যাদি)। আমরা খুব সহজেই বলতে পারতাম, “এই গুলু, বসবার ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিয়ে আয় তো।” কিন্তু আমরা সেটা বলি না। সেইটি কলকাতায় করলে চলে, কিন্তু বিদেশে এতে আটকে গেলে নতুন প্রজন্মের বাঙলা শেখা হবে না। চরম আবেগ অনুভব করলে সে ভাব বাঙলা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে জানা চাই, কারন আমরা সম্পূর্ণভাবে সেইটি ইংরেজিতে কিন্তু করতে জানি, কিন্তু বাঙলাতে করতে গেলে ইংরেজির সহযোগিতা আমরা নিই। মনের আনন্দ বা রাগ যদি বাঙলায়ে প্রকাশ করতে কোন বাঙালি না পারে, সেইটা আমার মতে খুবই দুঃখজনক। এই দিচ্ছি আমি ঋতুপর্না সেনগুপ্তের বক্তৃতা এবিপি আনন্দা চ্যানেলের আলোচনায়ে, দেখুন দুএকমিনিট কিভাবে মনের কথা বাঙলায়ে বলতে অসুবিধেবোধ করছেন

প্রথমে শুরু করলেন ভালো করেই (এই ভাল/খারাপ বাঙলার বৈপরীত্যটিও আমি আপত্তি করি…ইংরেজি ভাষায় ভাষণ শুধু ১০০% সম্পূর্ণ ইংরেজিতে বললেই কিন্তু সে ভাষণ “ভালো” হয়ে দাঁড়ায় না), কুণ্ঠাবোধ শব্দ ব্যাবহার করলেন। ওইটি হয়ত আগে থেকে প্রস্তুত করে এসেছিলেন। কারন তারপর থেকে interesting, optimistic, instinctive, comparison, positive, ইত্যাদি, এমন সব ইংরেজি চলা আরম্ভ হল, যে আমার মনে খটকা লাগল, যে সত্যিই গো, এরকমভাবে বাঙলায়ে বাড়িতে কথা বললে বাঙলাভাষাটা বিদেশে বড় হলে কেউ শিখবে না। আমি আজকাল অসাধারণ প্রয়াস করছি, আমার লিখিত বাঙলার পর্যায়ে আমার কথিত বাঙলাকে ওঠাতে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা বাকি বাঙালি বন্ধুবান্ধব এমন কি নিজের আত্মীয়স্বজনদের সাথে এরকম বাঙলায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করি, ঠিক কি না? “Old-fashioned” লাগে? না কি লোকে ভাববে “ব্যাটা পোঁদ-পাকামি করছে তো, নিজেকে কি একটা পণ্ডিত মনে করে”। কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা কোনটাই নয়। আবার অন্য ভাষার সাথে তুলনা করি, ইংরেজিতে কেউ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে কথা বললে কেউ তাকে old-fashioned বা পণ্ডিতি-মারা ভাবে না, তাহলে বাঙলায়ে কেন? লজ্জা পাওয়া নিয়ে শুধু এইটুকুই বলব, আপনার “ভালো” বাঙলার প্রধান গ্রাহক হবে আপনার শিশু, যার জীবনে এর থেকে কেবল সুবিধাই সুবিধা…তারপর বাকি সবাই কি ভাবে বা না ভাবে, কি যায় আসে?

কথ্য বাঙলায়ে ইংরেজি ত্যাগ করলেও কিন্তু পথ কঠিন। সারাক্ষণ একজন গুরুজন ছোটোর সাথে বাঙলায়ে কথা বললেই শেখানোতে সঙ্কট থাকবে। সে গুরুজন আরেকজন বড়োর সাথে বাঙলায় দৈনন্দিন কথা শোনার সম্ভাবনা না থাকলেও আপনি বাড়িতে বা গাড়িতে বাঙলাভাষায়ে দুনিয়ার খবরাখবর শুনতে পারেন। এর সক্ষমতারও এক সীমা আছে, অন্তত যতদিন পর্যন্ত বাচ্চা বাঙলা বুঝতে পারছে না আর সে যে পৃথিবীর উল্টো কোনায় বড় হচ্ছে, তার অনুভব করতে পারছে না। কারন হচ্ছে যে বাংলাভাষার চ্যানেলদের আন্তর্জাতিক পদচিহ্ন খুবই কম। এই যে এবিপি আনন্দা বা ২৪ ঘন্টা, এরা একেবারে পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক। আমি ওদের ওপর এই অঞ্চলকেন্দ্রিকতা নিয়ে আপত্তি করছি না, কারন ওদের নিজস্ব দর্শকব্রিন্দ তাই দেখতে চায়, তবে আমিও গাড়িতে চলাকালীন কতক্ষণ আর শুনব দার্জিলিঙের চাবাগানের পোকার কথা? পৃথিবীর সমস্ত সংবাদ বাঙলায় পেশ করার আছে কি কেউ? আমি বাংলাদেশি বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম বিবিসি বাঙলার কথা, কিন্তু এদেরও কিন্তু একেবারে বাংলাদেশকে ঘিরে কথাবাত্তা, হয়ত দুএকটা আন্তর্জাতিক বড় কান্ড বিবরণ করবে, কিন্তু গভীর আলোচনা বাংলাদেশকে ঘিরেই। এইগুলোরও মূল আছে, কিন্তু শুধু এতেই সীমাবদ্ধ আছে আমার বাংলাভাষার খবর ও আলোচনার জগত। তাতে আমার পক্ষে বাঙলা শেখানোটা শক্ত হয়ে পড়ছে। আবার, অন্য ভাষার সাথে তুলনা করব, যে ভাষা ইংরেজি নয়। আপনি চাইলে আপনি পুরো অলিম্পিক্সটা আরবি বা স্প্যানিশ বা ফ্রেঞ্চ বা চিন বা জাপানি ভাষায় শুনতে ও দেখতে পারবেন। কিন্তু কোন বাংলাভাষার মিডিয়াঘর তাদের সাংবাদিকদের ব্রেজিলে পাঠাবে না অলিম্পিক্সকে বাঙলায়ে দেখাতে, ইউসেইন বল্টকে ইন্টার্ভিউ করে নিচে বাঙলায় লেখা অনুবাদ বা ডাব করতে, বা দীপা কর্মকরের পেছনে ঘুরঘুর করাতে। টাকার অভাব বা কমতির বিষয় কি না আমি জানি না, হতেও পারে, কিন্তু আমার মনে হয় তিনটে-চারটে প্লেনের টিকিট, হোটেল আর গাড়ি ভাড়া আর খাবারের খরচ, এসবের পয়সা আছে। মার্কেট না থাকলেও মার্কেট অনেক সামাজিক জিনিশেই দেখবেন, হাওয়া থেকে গড়া যায় (যেমন দেখুন গত কয়েক দশকের ফেয়ার অ্যান্ড লাভ্লি, বা আজকালকার ফেয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডসাম…ওইগুলো নিয়ে আর এখানে বেশি লিখব না আজকে)। জাতিকে যখন এত সহজে তার শারীরিক সৌন্দর্য আর আত্মবিশ্বাসের ওপর মানসিক আঘাত পৌঁছানো যায়, তাহলে তার উল্টোটাও (জাতির সেবা) একই ভাবে সহজ হওয়া উচিত। দরকার আছে, যেমন আমার মুসলমান ভাইরা বলে…নিয়্যতের।

তা ছাড়া সোশাল মিডিয়াতেও বাংলাভাষার ছাপ ছোট। পডক্যাস্টে কত হাজার হাজার লোকের ভ্যাড়রম শোনা যায়। পৃথিবীর সব ভাষাতেই আছে পডক্যাস্ট। ইংরেজিতে তো দেখি, কেউ কিছু ঘন্টাখানেক ধরে সমাজ চর্চা করে, কেউ বেড়ানো নিয়ে কথা বলে, কেউ হাঁসির বা ভুতের গল্প, কেউ বিবাহ-সম্পর্ক নিয়ে পরামর্শ দেয়, কেউ স্টক মার্কেট নিয়ে কথা বলে। আমার স্ত্রী আজকাল তিনজন ফাজিল বেকার ছেলের পডক্যাস্টে পাগল হয়ে গেছে, সাথে আমারও মাথা খাচ্ছে। ছেলেগুলোর মন্তব্য যে অন্য জগতের অস্তিত্বরা নাকি পিরামিড বানিয়েছিল, আমরা ওদের পুতুলখেলা, ইত্যাদি। আমি ভাবলাম, আচ্ছা এরা ক্যাবলা হলেও, এরকম তিনজন বোকার ভ্যাড়রমও যদি বাঙলায় পাই, মন্দ নয়। ও বাবা, বাঙলায় কেবল ১২টি পডক্যাস্ট আছে। আপ্লডার কেবল একজনই, জশুয়া প্রজেক্ট। সব আদম আর ইভের কাহিনী, জিশুকেষ্টর বানী, ইত্যাদি। এতে খারাপ কিছু নেই। ধার্মিক আলোচনাও ইংরেজি ভাষায় প্রচুর আছে পডক্যাস্ট, এবং সমস্ত ধর্মেরই আছে, কিন্তু বাঙলার হচ্ছে এই অবস্থা পডক্যাস্টের জগতে। ইউটিউবে সেদিন দুটো ফাজিল বাঙালি ছেলের মজার একটা ভিডিও ব্লগ পেলাম, কিন্তু ওরাও সেই ইংরেজিতেই বা ইংরেজি-মেশানো বাঙলাতে কথা বলে। https://www.youtube.com/channel/UCYwlGjV9NCYxwVBSqFIzj5w/featured

আমার প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলব যে বেশিরভাগ কলকাতা থেকে আসা বাঙালি আমেরিকার জায়গায় জায়গায় একটি সরস্বতী পূজা ও একটি দুর্গা পূজার অনুষ্ঠান করে। তাছাড়া শনিরবিবারগুলোতে সারাক্ষণ ওই এলাকার প্রবাসী বাঙালি সমাজের মধ্যেই ঘুরঘুর/নেমন্তন্ন ইত্যাদি চলতে থাকে। সেই নেমন্তন্নগুলোতে অবাঙালিরা কেবলমাত্র তারা হয় যারা বাঙালি বিয়ে করেছে। এই জমায়েতগুলোতে একজন অবাঙালি পক্ষ হলেই কিন্তু যেন সমস্ত সংগ্রহের ওপর অস্বস্তি ছড়িয়ে যায়। যারা বাঙালিরা, তারা হাজির হয়েছে সপ্তাহের শেষে তাদের গুষ্টির সাথে গপ্প করতে, চাবিস্কুট খেতে, কলকাতা আসাযাওয়া নিয়ে, কার বিয়ে হচ্ছে, ট্রাম্প কি বলল, ইত্যাদি। তবে জমায়েতের আরেক মূল কারন হচ্ছে বাংলাভাষায় কথা বলার সুযোগ পাওয়া। এইখানে একজন অবাঙালি থাকলে সবাই একধরনের চাপ পায়, ইংরেজিতে কথা বলতে। আবার সে অবাঙালি মানুষও এইটা বোধ করে, যে আমি যেন এই সংখ্যালঘু সরনার্থী শিবিরে আক্রমণ করছি। কিন্তু তারও একটা অধিকার আছে, মাসের পর মাস যদি প্রত্যেক নেমন্তন্ন এই প্রবাসী বাঙালি গুষ্টির সাথেই হবে, তাহলে তারও তো খারাপ লাগবে। আচ্ছা তাকে বাদ দি, কেননা এইটা স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কের বিষয় এবং এই অস্বস্তি শুধু বাঙালি-অবাঙালি বিবাহ এবং তাদের আশেপাশের বন্ধুবান্ধবদের, কিন্তু বাচ্চাদের কি অবস্থা? বাচ্চারা পাচ্ছে না দেখতে বাকি আমেরিকান সমাজের বন্ধুবান্ধবদের। বাবামায়ের যদি সমাজে শুধু বাঙালি বন্ধুই হবে, সেটাও ক্ষতিকর। এই গুষ্টিগুলোতে যোগ দিয়ে যে বাচ্চারা বাঙলা শিখছে, তা নয়। সমস্ত গুরুজনেরা সেই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের মতন বাংলিশ বলতে অভ্যস্ত, যা শুনলে বাচ্চাদের বাঙলা জানবার দরকার থাকেই না, তার সাথে বাকি বাচ্চাগুলোও বাঙলা জানে না। ওই গুষ্টিতে কেবল এক প্রধান বিভাজন থাকে…বড়রা, যারা বাংলিশে হোহোহাহা করছে (আর মাঝে মধ্যে সেই বেচারা অবাঙালি ব্যাক্তির সাথে how are you করছে), আর ছোটরা, যারা তাদের বাবামাদের ঠাট্টা-আনন্দে যোগদান কোনদিন করতে পারবে না। এক বাঙালি পরিবেষের গুরুত্বটা আমি অস্বীকার করব না একজন বাঙালি গড়তে, কিন্তু সে বাঙালি পরিস্থিতিটার স্বভাব আসলে কেমন, সেটার ওপর নজর দেওয়া দরকার। আমার কিছু আমেরিকায়ে জন্মানো-ও-পালিত বাংলাদেশি মুসলমান বন্ধু আছে, যারা বাঙলায়ে একদম অনর্গল, এমন কি তাদের আঞ্চলিক টান পর্যন্ত আছে। তারা  গ্রীষ্মকালের তিনমাসের ছুটি কাটাতো তাদের বাংলাদেশের গ্রামের বাড়িতে, যেখানে লোকজন ইংরেজি জানেই না, কিংবা জানলেও বাঙলায়ে কথা বলার সময় বাংলিশ মারে না। সেই থেকে এরা বাঙলা শিখেছে, প্রবাসী গুষ্টি থেকে নয়।

সমাপ্তে আমি নিজের প্রকল্পিত পদ্ধতির সংক্ষ্যেপ করব। সংখ্যালঘু অবস্থায় বাঙলা জানা এক শিশুর কাছে অমূল্য আমেরিকায় বড় হতে হলে। এ শেখার জন্যে বাঙালি গুরুজনদের কেবল বাঙলাতেই কথাবাত্তা বলতে হবে বাচ্চাদের সাথে। কোনরকমের ইংরেজি মেশানো চলবে না। আজকাল আর ডিকশানারির দরকার নেই, পকেটে আছে স্মার্টফোন ও গুগল ট্রান্সলেট। কথার সাথে লিখিত বাঙলা শেখানোর আয়োজন করা উচিত। দেশে আমরা ১২টা না কত সাবজেক্টে পড়াশোনা করতাম, এখানে ক্লাস ১২ পর্যন্ত ৬টা করে ক্লাস হয় বছরে। সুতরাং চাপ কিছুই নেই, বাঙলা ক্লাস চালু করা উচিত বাড়িতে। বৃহৎ আমেরিকান বাস্তব সমাজের আড়াল কেটে বসবাস করা অনুচিত। কাজের রেডনেক বন্ধুর বাড়িতে বারবিকিউতে যোগ দিন, কালো বন্ধুর বাড়িতে রবিবার এনেফেল আমেরিকান ফুটবল দেখুন। বাচ্চা যেন না দেখে যে আপনাকে (অতএব তার বাঙালি জাতিকে) বাকি সমাজ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে। বাকি প্রবাসী বাঙালি গুষ্টির সাথে ওঠানামা নিজের আনন্দের জন্যে করলে করুন, কিন্তু এতে আপনার বাচ্চার সামগ্রিকভাবে লাভ না লোকসান হচ্ছে, সেইটি বিবেচনা করা উচিত। সমস্ত প্রবাসী পরিবারের কাছে তাদের বাচ্চাদেরকে ভারত বা বাংলাদেশের কোনও একটা গ্রামের বাড়িতে রাখা বছরে তিন মাসের জন্যে এক অসম্ভব প্রস্তাব। আমার চোদ্দপুরুষের মধ্যে কেউ গ্রামে থাকেনি, সবই ওই কলকাতার আশেপাশের, আর আমি কাউকে চিনি না যৌথ পরিবারে যে কেবল বাঙলা জানে, ইংরেজি জানেই না। সুতরাং আমার বাংলাদেশি-আমেরিকান বন্ধুর মতন পরিবেশ পাওয়া অসম্ভব, কিন্তু না পাওয়া মানে হার মানা, তাও চলবে না।

আশা করি আমার মন্তব্যতে লোকজন আক্রান্তবোধ না করে, যদিও দুঃখবোধ হওয়া স্বাভাবিক।

শেষে একটি গান রেখেদিলাম, বাংলাদেশের সিলেট জেলার কবিয়াল ফকির লাল মিয়াঁর লেখা, সাথে গানের কথা নিচে দিচ্ছি।

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থাকি করো শিল্পের বড়াই
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক তবু ভাই পরের ও বাসা
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”

ছোটোবেলা টনসিলে গাল প্রায় ফুলতো
মা’র কোলে মাথা রেখে সারা রাত কাটতো
ঘুম নাই মা’র চোখে, সারা রাত জাগতো
বাংলায় সুর করে ছড়া-গান গাইতো।

বড় হয়ে সেই মা’কে তুমি-আমি ভুলে যাই
মা’র সেই রাত জাগা রাত আর মনে নাই।
মা’কে দেই কষ্ট, তার কথা শুনি না
মা’র গাওয়া ছড়া-গান আর ভালো লাগে না। হয়তো বা ভুলে গেছি মা’কে দেওয়া কষ্ট
ছোটখাটো কাজ নিয়ে হয়ে গেছি ব্যস্ত।
বড় ভাই ওরা যদি আজ বেঁচে থাকতো
দিন রাত মা’র মুখে হাসি ফুটে থাকতো
মা’র চোখে জল আর বুক ভরা বেদনা
আমাদের না আছে নাম না ঠিকানা
কী ছিলাম কী হয়েছি! লজ্জায় মরে যাই
মা যে কবে হেসেছিলো একটুও মনে নাই।

কার্জন হল থেকে সুর ভেসে আসলো
জিন্নাহ’র কথাগুলা বুকে এসে লাগলো
হারামিটা করেছিলো অবিচার অন্যায়
মা’র মুখ ভিজেছিলো বেদনার কান্নায়

রাজপথ ভেসেছিলো রক্তের বন্যায়
ইতিহাস গড়েছিলো বাহাদুর বাঙালি
আজ সেই বাঙ্গালিকে অপমান করেছি
জব্বার রফিকের মিছিলের মানে কী?

তুমি আমি সব আজ হাটুভাঙ্গা বাঙালি
সব তারা দিয়ে গেলো, আমরা কী করেছি?
নিজের ভাষাকে ভুলে পরেরটা শিখেছি?
হাততালি জুড়ে দাও, সাব্বাশ এই বাঙালি!

নিজের কপালে আজ নিজে লাথি মেরেছি
গায়ের চামড়াটাও নিজ হাতে ছিঁড়েছি
ছি ছি ছি দেখো বাঙ্গালির কাণ্ড
বেহায়া বেশরম দুনিয়ার ভণ্ড।

বাবুই পাখিরও যদি ইচ্ছা করতো
অট্টালিকাতে তারাও থাকতে পারতো
নিজের সেই কাঁচা ঘর ছাড়তে সে রাজি না
কোনো ঝড় তার মত বদলাতে পারেনা

নিজের সেই কুঁড়েঘর ফেলে রেখে যায় না
ছি ছি ছি দেখো বাঙ্গালির কারবার
মরে গিয়ে পাখি হয়ে জন্মানো দরকার
মাইকেল মধুর এই বঙ্গ ভাণ্ডার।

আমাদের ফাঁদে পড়ে একবারে ছারখার
বাংলার কবি রা কলম হাতে বসতো
বিশ্বটা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতো
নজরুল-ঠাকুরের বাহাদুরি চলতো

প্রতিবেশী দেশগুলা মাথা নত করতো
একদিন ওরা ছিলো বাংলার ভক্ত
কালকে যে কী ছিলাম আজকে কী হয়েছি
ডোরাকাটা বাঘ থেকে নাক কাটা বাঙালি!

ভাঙ্গা মন

হায়রে আমার কলকাতা। তোকে ছাড়া যেন এক যাযাবরের মতন সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াই। ২ বছর এখানে, ৩ বছর ওখানে। এই করে অনেক জায়গাকে পর্যটকের চেয়ে ভালো করে শিখেছি, তবু কোথাউকার বাসিন্দা হয়ে উঠিনি। মন যেন চায় না তা হতে। প্রত্যেকবার নিয়ম করে কিছু মাস বাদে জায়গাটা একঘেয়ে লাগবেই লাগবে। আমি নিজেকে লক্ষ্য করে দেখেছি, অনেকটা ব্যাটারির মতন। কলকাতা গিয়ে রিচার্জ না হলে বোধয় ছটফট ছটফট করি ভেতরে। আশেপাশের সবাইকে হয়ত একটু বিরক্তও করি। আর গিয়ে কি খুশি। কলকাতায় যেন full formএ আসি। তখন হুমড়ি খেয়ে দিনে ৭-৮টা ১০০ গ্রাম মিষ্টি দই সাঁটাই, রাস্তায়ে ৪০টা ফুচকা খাই। আর এবার তো লোক আমাকে রাস্তাঘাটে ঠিকানা পরিচয় জিজ্ঞেস করল। কি আহ্লাদ কি আহ্লাদ! এতদিন ধরে আমেরিকার বাঙালি গোষ্ঠীগুলোতে কিরকম আড়ালে আড়ালে থাকতাম। কে জানি কেন। আমার কিশোর বছর যে কেবল আমেরিকাতেই নয়, তবে আমেরিকার তুলনাতেও এক অতি ফরোয়ার্ড জায়গাতে (মায়ামি, ফ্লরিডা) কাটিয়েছি, এর ছাপ আমার মধ্যে অনিবার্য। সুতরাং এইরকম জিনিশের দিক থেকে আমি সেই মেল-বন্ডিংটা সমবয়সী বাঙালি ছেলেদের সাথে পেরে উঠি নি আমেরিকাতে। কিন্তু মনে হয় আজকাল ভারতের নাগরিক অনেকেই, বিশেষত আমার প্রজন্মের, দেখছি নিজের দেহের দিকে লক্ষ্য রাখছে। আমেরিকাতে সাধারন পুরুষমানুষ দৌড়ঝাঁপ, পুশাপ ইত্যাদি অন্তত করে। জীবনসাথি জোগাড় করাটা নিজের ঘাড়েই পড়ে, বাবামায়ের নয়, সুতরাং এই ফ্রি মার্কেটে নিজের শারীরিক সৌন্দর্যও একটি সম্পদ (পড়াশুনা, পয়সাকড়ি, এদের পাশাপাশি)। আজীবন রসগোল্লা খাব, ২ কিলোমিটার হাঁটতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে, মারিয়া শারাপোভার ছবিকে পুজো করব, আর পছন্দের মেয়ে দেখলে তাকে আড়াল থেকে ভিতুর মতন থাকব, এসব চলে না। আমেরিকাতে চলে না, ভারতেও বোধয় এখন ওই ৯০ লাখ বেশি ছেলে মেয়ের চেয়ে বলে সেই চাপে এখন ফ্রি মার্কেট তৈরি হচ্ছে। ভালো, তা হোক। এখন কলকাতায়ে গেলে লোকজন রাস্তাঘাটে বিদেশি বা প্রবাসী আর ভাবে না আমাকে নিয়ে। পাড়ার দাদা/মস্তান মতন লাগে মনে হয়।

যাই হোক, কলকাতায় এবার গিয়ে একদিন কলেজ স্ট্রিটে গিয়েছিলাম বাঙলা বইয়ের ধান্দায়ে। মেট্রোয়ে গেলে সেন্ট্রাল বা মহাত্মা গান্ধি রোড স্টেশন যে কোনতেই চলবে। আমি গেলাম মহাত্মা গান্ধি রোড অবদি। আমি জানতাম সেখান থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব দিকে গেলেই বইপাড়া পাব। তাও মেট্রো থেকে বেরিয়েই উল্টো দিকে হাঁটা দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে যখন বিবেকানন্দ রোডে পড়লাম, তখন বুঝলাম উল্টো দিকে হেঁটেছি। এটা মাত্র ১০ দিন আগের কথা। তাই বলছি। যতদূর মনে পড়ছে, বিবেকানন্দ রোডে আমি একটা অসমাপ্ত ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে নীরবে হাঁটছিলাম। গতকালের খবর শুনে একটা ভয় আর আঘাত তো মনে লেগেছেই। ওই ভয়ানক ভিডিওটা যতবার দেখি, ততবার ইচ্ছে করে সেই নিরীহ গাড়ি ও অটোদের বলতে পালাও, কিন্তু তারা কিছুতেই পালাচ্ছে না। ভিডিওটা দেখলে মনে হয় সেখানে আমিও হতে পারতাম, সেখানে তুমিও হতে পারতে। আসলে সকলেরই মনে হওয়া উচিত, যে ওটার তলায় আমরা সকলই ছিলাম।

দোষ এখন কার ঘাড়ের ওপর চাপবে? অথবা কার ঘাড়ের ওপর চাপালে সকলে খুশি হবে? আমি এবার গিয়ে কিছু জিনিশ লক্ষ্য করেছি, যা নিয়ে নিজের মতামতটা জানাব এখানে। ট্যাক্সিওয়ালা থেকে খাবারের দোকানের লোক, সবার মুখ থেকে শুনলাম রাস্তাঘাটের উন্নতির পেছনে যে পয়শা খরচ করা হচ্ছে, সেগুলো সারদা-নারদা ইত্যাদি চুরির টাকায়। কথাটা যে কত লেভেলে ভুল, সে আর কি বলব। চুরি করা টাকার কিছু অংস দিয়ে যদি রাস্তাঘাট তৈরি হয়, তাহলে খারাপ কি? পুরোটাই পকেটমার হয়নি, এই ভালো। জনগণের পরিশ্রমের মাইনের খাজনা দিয়ে জনগণের সরকার রাস্তা মেট্রো ব্রিজ ইত্যাদি বানাবে না তো কি করবে? আমার মনে হয় ৭০ বছর বাদেও সরকার যে জনগণের চাকর, এ কথাটি এখন অবদি লোকের মনে ঠিক মতন বসেনি। সমস্ত “নেতা” নিজেকে এলাকার রাজারানি হিসেবে চলাফেরা করে, আর এ চলাফেরা মানুষ নির্বিকারভাবে সহ্য করে। এখন এই ফ্লাইওভার ভাঙ্গা নিয়ে মমতার ওপর দোষারোপ লাগানো হবে এক পক্ষ্য থেকে যে সে নির্বাচনের আগে কাজে তাগাদা লাগিয়েছিল বলে এ অঘটন ঘটল। এর থেকে আমাদের হতাশ জনগণ কি বুঝবে? যে সময় মতন কাজকম্ম হয়ে যাওয়াটা আশা করা অনুচিত? একদিকে একজনরা ৩৫ বছরে কিচ্ছু করেনি। আরেক দিকে ৫ বছরের আমলে কোন কাজ না করে জনগণের টাকা পকেটমার করে নির্বাচনের আগে লাস্ট মিনিটে তাগাদা দিয়ে ধুমধাম জিনিশ ভেঙে পড়ছে। এরকম করে বিধ্বস্ত মানুষের মনকে আরই হতাশ করা হবে। নিজের নির্বাচিত সরকার ও নেতৃত্ব যে নিজের সেবা করবে, সে অনুমান তো বহুকাল ভাঙা হয়ে গেছে, কিন্তু তা গড়ার কোনদিন কি উৎপাদন হবে? এরকম করে চললে কোনদিন হবে না। এর চেয়েও বিফল করে যখন সাধারন মানুষ বলে সুনিশ্চিতভাবে যে এবার তৃনমূল জিতবে, যেমন এইটি ভাগ্যে লেখা আছে। নিজেরা কট্টর বামপন্থী হলেও এরকম করে বলার কোন মানে হয়? এত সব বুঝি না গো। সিস্টেমটা আছে, যাতে লোক যদি কাজ ঠিক মতন না করতে পারে, তাহলে তাকে দোহাই দেব ৫ বছর অন্তর। আমার কাজে এখানে একটা ছেলে তামিল নাডুর থেকে। সে ভাবতেই পারে না যে এক জনসংখ্যা যুগের পর যুগ একই দলকে সমর্থন করে যাবে। আমার মনে হয় এ নির্বাচনে অন্তত কলকাতা শহরে যত বিধান সভা সিট আছে, ওগুলোতে নাইবা তৃনমূল নাইবা কাস্তেহাথুড়িহাথের জেতা উচিত। শুনলাম সেদিন ওইখানে যখন তৃনমূল আর বাম নেতারা হাজির হল, তখন “সব চোর হে” স্লোগান ভিড় থেকে উঠেছিল। এ রাগটা থাকা দরকার, কিন্তু এটা আরও হতাশায়ে পরিনত হওয়া উচিত নয়। সময়ের মধ্যে সামাজিক কাজকম্ম সারা উন্নত দেশে হয়ে যায়, ভারতেও কিন্তু এইরকম কখনও শুনি না গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে হতে। দেশপ্রেমিক ও সমাজসেবক নেতৃত্ব না হলেই এমন হয়। নরেন্দ্র মোদী একা দিল্লিতে বসে সব সুদ্রতে পারবেন না। সৎ এবং সক্ষম মানুষ ভারতের ওলিতে গলিতে আছে। তাদের নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে, সফল হতে হবে। এরকম হতাশ আর চলতা হে বললে কোনদিন সুদ্রবে না কিছু।

আমার বরাবর আশা থাকবে, যে কলকাতা একদিন নিউ ইয়র্ক টোকিওদের শ্রেণিতে ফের পৌঁছবে। সেই গতিশীলতা কলকাতার মানুষের দৈনিক জীবনযাপনে আমি দেখতে পাই, অনুভব করি। এরকম হতাশ ও অক্ষম মনোভাব কারুর পক্ষেই প্রাপ্য নয়, বিশেষ করে আমার রিচার্জ স্টেশনের।

এইখানে একটা লিঙ্ক দিচ্ছি, দেখাতে এখন কি চিন্তাধারার নেতৃত্বের তলায় বাস করলে কিরকম আরশোলার মর্যাদায় জীবন মানতে হয়। এটা পড়ে রাগ ছাড়া আর কিছুই মনে আসা উচিত নয়। কিন্তু রাগের পর কি?

http://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/West-Bengal-government-fails-disaster-test-rescue-operation-begins-late/articleshow/51640181.cms